কবিতায় রুবী রহমান :: কামরুল হাসান



নারী লেখকদের সংগঠন গাঁথার একেকটি অনুষ্ঠান হয় একেকপ্রকার। কখনো বিদেশি সাহিত্য, কখনো বিশিষ্টজনের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা ও পাঠ, কখনো কবিতা ও গল্পপাঠ প্রভৃতি। তবে সেসবের কেন্দ্রে থাকেন একজন নারী লেখক। কাল ছিল ষাটের বিশিষ্ট কবি রুবী রহমানের সাহিত্য নিয়ে পাঠ ও আলোচনা। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের মাইডাস ভবনের দশতলার ইএমকে সেন্টারের ‘গল্প’ নামের ছোট হলঘরটি গাঁথার নিজস্ব হলঘরে পরিণত হয়েছে।

সাধারণত গাঁথার অনুষ্ঠানগুলো হয় বিকেল চারটেয়, কিন্তু আজকেরটি শুরু হবার কথা দুপুর তিনটায়। আজ ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে সামার সেমিস্টারের ভর্তি পরীক্ষা। দুটো নাগাদ সে দায়িত্ব শেষ হলে আমি উবার মোটরবাইক ডাকি। ছুটির দিনের পথ কিছুটা ফাঁকা থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাই কাঁটায় কাঁটায় পৌনে তিনটায়, ঠিক রিপোর্টিং টাইমে। ‘গল্পে’ পৌঁছে দেখি পাপড়ি রহমান, ইশরাত তানিয়া ও আফরোজা আকতার টিনা- গাঁথার সভাপতি ও দুই সদস্য বাকিদের অপেক্ষায়। ক্ষণিক বাদেই এক গাদা ফুল ও ব্যানার হাতে এলেন ফুলের মতো সুন্দর গাঁথার সদস্য এবং আজকের অনুষ্ঠানের উপস্থাপক লায়লা মুন্নী।

ইএমকে সেন্টারের দুই কর্মী এসে প্রধানত সবুজ রঙের ছোট ব্যানারটি জলস্বচ্ছ স্কচটেপ দিয়ে সাদা বোর্ডটিতে টাঙ্গিয়ে দিলেন। ব্যানারটিকে নিষ্প্রভ মনে হলো আর ঐ কর্মীদ্বয়ের উচ্চতার অভাব তাকে স্থাপন করল কিছুটা নিচে। ‘গল্প’র পাশেই আলোকিত এক করিডোর, যে করিডোরের কাব্যময়তা অবলোকন করতে করতে আমরা পৌঁছাই ‘গল্প’-এ। করিডোরটির একপাশে থাকে ফ্রেমেবাঁধানো ফটো। সেসবকে উজ্জ্বল দেখাতেই অত আলোর সমারোহ। আলো আর শিল্পের সেই টানেল হয়ে উঠেছে এক ফটো স্টুডিও। সেখানে উপস্থিত চারজনের ছবি তুলছি, তখুনি এলেন খাতুনে জান্নাত, পঞ্চমজন। আগেকার মতো এখন আর আমরা ছবি প্রিন্ট করে অ্যালবামে ভরি না, তাতে আমাদের ছবি তোলার বাসনা কিন্তু কমেনি। ছবি তোলার বাসনার যদি একটি রেখচিত্র আঁকা যেত, তবে তা হতো উল্টানো U এর মতো। শৈশব কৈশোরে কম, যৌবনে ঊর্ধমুখী, মধ্যবয়সে শীর্ষে আর প্রৌঢ় বয়সে পড়ন্ত। এই রেখচিত্রটি অনেকটা জীবনচক্রের মতো।

আমার পাশে এসে বসলেন কবি ও কথাসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ। অত্যন্ত রুচিশীল মানুষটি আমার সাথে দেখা হলে আমার লেখার প্রশংসা করেন। বুঝি তার মনটি উদারতায় পরিপূর্ণ । আমাকে তার বাড়িতে চায়ের আমন্ত্রণ জানালেন আর বল্লেন, আমি যেন আমার ভ্রমণগ্রন্থগুলো নিয়ে যাই। তিনি সংগ্রহ করবেন। কথাপ্রসঙ্গে জানলাম তার ছেলে অস্ট্রেলিয়া ও মেয়ে আমেরিকায় থাকে। তিনি পালা করে ছেলে ও মেয়ের কাছে যান ও দু’মাস করে থাকেন। ঐ দুমাসেই নাকি হাঁপিয়ে ওঠেন, সন্তানরা যদিও বেড়াতে নিয়ে যায় অনেক জায়গায়, তবু ছটফট করেন দেশে ফিরতে। ভাবি, কী জাদু আছে এই বাংলায়!

হঠাৎই সেখানে এলেন আমার বহুকাল আগের সহকর্মী ড. আনিস পারভেজ। সেই ১৯৯৮ সালে আমরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে পড়াতাম। সেসময়েই তিনি আমেরিকা চলে যান পিএইচডি করতে। কুড়ি বছর পরে তার সাথে দেখা হল। যতদূর মনে পড়ে তিনি পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন ই-কমার্সের উপর, আজ জানলাম তার থিসিস ছিল ভুবনখ্যাত জাপানি চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোশায়ার সবচেয়ে আলোচিত ছবি ‘রশোমন’-এর উপর। একে একে গাঁথার সদস্যগণ এসে হলঘরটি পূর্ণ করে তোলেন। তাও পূর্ণ হয় কি? আজকের ড্রেসকোড সাদা শাড়ি। চারপাশে সাদা পরীদের ওড়াউড়ি দেখছি আর ছবি তুলছি। সাদা শাড়িতে ফুল, প্রজাপতি, লতাপাতার সৌন্দর্যময় জড়াজড়ি। লায়লা মুন্নী ঘুরে ঘুরে বাঁধাই খাতায় নামস্বাক্ষর ও সদস্যদের অংশগ্রহণমূলক টাকা (ঐচ্ছিক) তুলছেন।

যার কবিতা নিয়ে আজ আলোচনা হবে সেই কবি রুবী রহমান কিছুক্ষণ আগে মৌলভীবাজার থেকে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। মৌলভীবাজারে তিনি গিয়েছিলেন ‘কোরাস’ সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করতে। স্বভাবতই তার দেরি হলো ‘গল্প’-এ এসে পৌঁছাতে। মূল মানুষটির অপেক্ষায় গাঁথার চিরায়ত নিয়ম, সঠিক সময়ে শুরু আর সঠিক সময়ে শেষ, আজ ব্যাহত হলো। তিন আলোচকের দুজন এসেছেন, তাও দেরি করে আর একজনের তো দেখাই নেই।

 

ঘড়ির কাঁটা মেনে চলতে অভ্যস্ত গাঁথার সভাপতি কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান অস্বস্তি লুকাতে পারলেন না। তিনটা চল্লিশ নাগাদ তিনি অনুষ্ঠান শুরু করে দিলেন আর বারংবার বল্লেন গাঁথার প্রথা ভাঙার মনঃস্তাপ। উপস্থাপক লায়লা মুন্নী আলোচক দুজনকে মঞ্চে (সে অর্থে কোন মঞ্চ নেই, সমুখে পেতে রাখা একটি কাচঢাকা নিচু কাঠের টেবিলের পেছনে তিনটি বিশ্বস্ত চেয়ার গায়ে গায়ে দাঁড় করানো) এসে বসতে অনুরোধ জানালেন।

লায়লা মুন্নী কবি রুবি রহমানের যে সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরলেন তা হলো তিনি ষাটের নিরীক্ষাধর্মী কবি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন আর কলেজে পড়িয়েছেন দীর্ঘ ৩৬ বছর। তার কাব্য সংখ্যা চার। ২০১০ সালে লাভ করেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার, তার আগে ২০০৪ সালে পেয়েছেন অনন্যা পুরস্কার। সম্প্রতি (২০১৭) পেলেন কবি মাজহারুল ইসলাম পুরস্কার। ষাটের কবি হলেও তার প্রথম কাব্য (যৌথ) ‘ভালোবাসার কবিতা’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে। এরপর ‘যে জীবন ফড়িংয়ের’ ও ‘কান পেতে আছি’। দীর্ঘ বিরতিতে বেরিয়েছে ‘তমোহর’। তিনি নবম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সাংসদ ছিলেন। এছাড়া অংশ নিয়েছেন আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পে।

 

আজকের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাটি এরকম- রুবী রহমানের কবিতা নিয়ে আলোচনা করবেন তিনজন আর তার কবিতা পড়বেন তিনজন। কবিতা পাঠ দিয়েই শুরু হলো। কবি ও গাঁথার সিনিয়র সদস্য মালেকা ফেরদৌস পড়লেন ‘তাপ্পি মারা কবিতা’ ও ‘তমোহরের জন্মদিন’। কবি ও প্রাবন্ধিক পিয়াস মজিদের আলোচনাটি আবর্তিত হলো রুবী রহমানের ‘তমোহর’ কাব্যটি ঘিরে। পিয়াস যা বল্ল তার সারমর্ম হলো রুবী রহমান কম লিখেছেন সত্যি, কিন্তু ভালো লিখেছেন। তার কবিতা একান্ত ব্যক্তিগত মনোলোক থেকে বিশ্বালোক পর্যন্ত বিস্তৃত। তার কবিতা বিন্দুর মাঝে সিন্ধুকে ধারণ করে। পিয়াসের মতে রুবী রহমানের প্রধান কবিতা হলো ‘ও টাঙ্গাইলের তাঁতি’ যার কয়েকটি সহযোগী কবিতাও আছে।

এরপর কবিতা পাঠে এলেন সুলতানা ফিরদৌসি। তিনি রুবী রহমানের দুটি ছোট কবিতা ‘ঠাহর করে দেখ’ ও ‘বায়োডাটা’ পাঠ করলেন। দ্বিতীয় আলোচক কবি ও প্রাবন্ধিক জুনান নাশিত জ্বর নিয়েই চলে এসেছেন, জ্বরতপ্ত হলেও তাকে স্নিগ্ধ লাগছে। পিয়াসের আলোচনাটিকে একাডেমিক মনে হয়েছিল, আর একাডেমিক বলেই কিছুটা নীরস। তুলনায় জুনানের আলোচনাটি ছিল আন্তরিক, উচ্ছ্বাসপূর্ণ। ষাটের যে সময়ে রুবী রহমান কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন, সেসময়টা ছিল উন্মুক্ত, প্রগতি চিন্তার কাল, এখনকার মতো অবরুদ্ধ ও পশ্চাৎপদ নয়। জুনান নাশিত পঞ্চাশের কবি আবুল হোসেনের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বেঁচে থাকা কবিদের মাঝে তখন সবচেয়ে দীর্ঘায়ু আবুল হোসেন বলেছিলেন, ‘রুবী রহমান কবি।’ শ্রদ্ধেয় কবির ঐ একটি বাক্য সবকথা বলে দেয়। জুনান নাশিতের মতে রুবী রহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘তাপ্পিমারা কবিতা’। জুনানের মতে রুবী রহমানের কবিতায় সূক্ষ্ম দর্শন রয়েছে, তিনি আটপৌঢ়ে বিষয়ের মাঝে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

কবি রুবি রহমান ‘গল্প’-এ পা দিলেন ঠিক চারটেয়। গাঁথা যদি ঐতিহ্য মেনে আরম্ভ করতো, তবে তাঁর দেরি হতো না একমিনিটও। তাঁর কবিতা পাঠ হয়েছে, তাকে নিয়ে আলোচনা চলছে, কিন্তু তিনি প্রারম্ভের ঐসব শুনতে পেলেন না। জুনানের আলোচনা তখন শেষপর্বে। স্নিগ্ধরুচি আর শান্তস্বভাবের রুবী রহমান তাঁর সৌন্দর্যময় উপস্থিতি আর মাধুর্যময় আচরণের জন্য সকলের প্রিয়। তিনি সুচেতনা ও সুভব্যতার একজন রোল মডেল।

আফরোজা আকতার টিনা এলেন কবিতা পাঠ করতে। তিনি যখন ‘তমোহরের সাথে কথা বলা’ কবিতাটি পাঠ করছিলেন, তখন লক্ষ্য করলাম কবি রুবী রহমান কী এক অন্তর্লীন বেদনায় মুহ্যমান, তার চোখে গভীর বিষাদের ছায়া। তমোহর তার প্রাণাধিক পুত্র, যাকে তিনি হারিয়েছেন এক দুর্ঘটনায়। কবি রুবী রহমান মাইক্রোফোনের সমুখে আসার আগে কবি দিলারা মেসবাহ ‘তাঁতির মায়াবী হাত’ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন, কবি খাতুনে জান্নাত পড়লেন নিজের লেখা কবিতা। এটি তার দ্বিতীয়বার গাঁথার সভায় আসা, আর জীবনে দ্বিতীয়বার রুবী রহমানকে সামনাসামনি দেখা।

কবি রুবী রহমান মাইকে এসে প্রথমেই গাঁথার সদস্যদের ধন্যবাদ জানালেন তার কবিতা নিয়ে আলোচনার আয়োজনের জন্য। এটা ভালোবাসারই প্রকাশ। এতে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন, গৌরববোধ করছেন। তবে যে কবিতা তিনি লিখতে চেয়েছিলেন তা লিখে উঠতে পারেননি। এখনো তেমন উল্লেখযোগ্য কবিতা তিনি লিখে উঠতে পারেননি। তার ঐ বিনয়ী উচ্চারণ সকলের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে উঠল। অথচ তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে, যখন তিনি নয় বছরের বালিকা। সুদীর্ঘ ষাট বছর ধরে কাব্যচর্চা করা বাংলা একাডেমী প্রাপ্ত কবি যখন ঐ উচ্চারণ করেন তখন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাই বাড়ে।

ঐ যে বলা হয়, কবিতার প্রথম পঙক্তিটি আসে স্বর্গ থেকে তাকে ধারণ করে রুবী রহমানের একটি কবিতার শুরুটা এরূপ ‘ঈশ্বর তুমি কবিতার একটি পঙক্তি পাঠাবে বলে ধূলির উপরে বসে আছি’। তিনি আজো অপেক্ষায় আছেন, কবিতার পঙক্তিটি আজো আসেনি। নিজের লেখা সম্পর্কে অমন নির্মোহ উক্তি ক’জন করতে পারেন? পাপড়ি রহমান স্মরণ করিয়ে দিলেন সেই প্রাজ্ঞকথা ‘ফলবান বৃক্ষের ডালই মৃত্তিকার দিকে নুয়ে আসে’।

শ্রোতাদের জন্য ফ্লোর উন্মুক্ত করা হলে প্রথম প্রশ্ন করলাম আমি। মোবাইল, কলম আর নোটবুক ফেলে মাইকের সমুখে। আমার প্রশ্ন ছিল তার কবিতার সংখ্যাস্বল্পতা নিয়ে। আলোচকরা যতই বলুক তারা গুণবিচারি, একথাও তো অনস্বীকার্য ষাট বছর সময়কালটি বেশ দীর্ঘ। কোন সে বাধা যা তাকে পর্যাপ্ত লেখার সুযোগ দিল না? এর উত্তরে রুবী রহমান প্রথমেই বল্লেন, মা হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা, কবিতা লেখার চেয়ে তাঁর কাছে মায়ের ভূমিকাটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে তিনি তার জীবনের অনেক জানা-অজানা বিষয় তুলে আনলেন। যেকথা তিনি পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বলেননি, তাই বল্লেন চেয়ারে উপবিষ্ট হয়ে। তিনি মনে করেন বিশ্বসাহিত্যেও আমরা খুব বেশি নারী লেখক পাই না, এর একটি কারণ হতে পারে নারীর মাতৃত্ব। সংসারের দায়িত্ব পালন করে লেখার অবসর বের করা কঠিন।

তাঁর নিজের সুন্দর জীবনটি তছনছ হয়ে গেছে এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায়। তিনি তখন আমেরিকায় আইওয়া কনফারেন্সে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা তাঁর স্বামী বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির বিপ্লবী নেতা কমরেড নুরুল ইসলামকে ঘরে আগুন লাগিয়ে হত্যা করে, বাবার সঙ্গে পুড়ে যায় তমোহর। শোকার্ত কণ্ঠে বললেন, আমার সংসারের অর্ধেকটা তো মাটির নিচে। কন্যাকে বুকে আঁকড়ে তিনি বেঁচে আছেন পর্বতের মতো ভারী শোক বুকে নিয়ে। তাঁর বেদনা ছুঁয়ে যায় আমাদের সকলের হৃদয়। তমোহরের জন্য আমরাও নিঃশব্দে কাঁদি।

 

এরপর প্রশ্ন করলেন ড. আনিস পারভেজ। ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য হিসেবে নবীনদের তরতাজা লেখাকে তিনি কীভাবে বরণ করেন -সেই প্রশ্ন। মাতৃস্নেহে ভরপুর এই অসামান্য সুন্দর কবি, যাকে ড. আনিস বলেছেন, সবচেয়ে সুন্দরী বাঙালি নারী কবি, আমি বলেছি জীবনানন্দের নায়িকা, পঞ্চাশ ও ষাটের কবিদের হার্টথ্রোব রুবী রহমান বল্লেন, তিনি তরুণদের বাতিল হয়ে যাওয়া লেখাটিও পুনর্বার পড়েন তা গ্রহণ করা যায় কিনা পরখ করতে, সেসব লেখা ফেলে দিতে বা ক্রসচিহ্ন বসাতে তার মন চায় না।

অনুষ্ঠান শেষ হলো পাপড়ি রহমানের আচমকা ঘোষণার ভেতর দিয়ে যে এটাই তার পরিচালনায় গাঁথার শেষ অনুষ্ঠান। আমরা ভেজিটেবল রোল, সন্দেশ, কাঁচাগোল্লা খেয়ে গ্রুপ ছবি তোলাও শেষ করেছি, এমনি সময় উপস্থিত হলেন প্রধান আলোচক জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। আন্তরিকভাবে দুঃখিত তিনি, বেশ ক’বারই বল্লেন সে কথা। এই অনাত্মীয় শহরে রুবী রহমান তার কাছে পাখির নীড়ের মতো শান্ত এক আশ্রয়। আনিসুল হক শুধালেন, ‘আপনার নতুন পাণ্ডুলিপি কি প্রস্তুত?’ বুঝি তিনি প্রথমা থেকে বইটি প্রকাশ করতে চান। তার সাথে আসা প্রথম আলো সাময়িকী সম্পাদক কবি আলতাফ শাহনেওয়াজ চাইলেন কবিতা। তাঁর কবিতাকে স্নিগ্ধ উল্লেখ করে আলতাফ বলল, রুবী রহমানের কবিতা পাঠে যে স্তব্ধতা পাঠককে গ্রাস করে, তা পাওয়া যায় না অনেক বড় (প্রচারিত ও জনশ্রুত অর্থে) কবির কবিতায়।

বিরলপ্রসূ, নিজের কবিতা নিয়ে ঘোরতর দ্বিধাগ্রস্ত, জীবনের নির্মমতায় শোকবিহ্বল কবি রুবী রহমান এর কোন উত্তর দিতে পারলেন না। ঐ যে বলেছেন, চাঁদের দিকে তাকাতে পারেন না, ছেলের মৃতমুখ ভেসে ওঠে, সেই মায়ের বেদনা কেবল মা-ই জানেন। আমরা কেবল সে বেদনার নিষ্ফল সাক্ষী। গাঁথা গেঁথে দিল এক নীরব শোকের মালা, যার লকেটটি আজকের বিকেলে কবি রুবী রহমান! তাকে বিনম্র শ্রদ্ধা!

কামরুল হাসান

1,331 Comments