ক্রিমসন রোজেলাকে ডাকে না-দেয়া চিঠি- ৩ :: পাপড়ি রহমান



পাপড়ি রহমান

তোমাকে মিস করার নানান অনুসঙ্গ এ-বাসার সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তোমার কাবার্ড গোছাতে আমি তিন মাস সময় নিয়েছিলাম। গোছাব ভাবলেই একেবারে স্থবির হয়ে যেতাম। কারণ কত জিনিস তুমি নিজের মতো করে রেখে গিয়েছ, সেসব আমার মতো করে গোছাতে গেলে একেবারে পেট থেকে দীর্ঘ কান্না উঠে আসতো। কারণ আমি চাই, তোমার রেখে যাওয়া সবকিছুই যেন তুমি আগের মতোই দেখতে পাও। যেন তুমি দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকোনি। যেন সকালে অফিসে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে এসেছ। ফিরে এসে দেখছ, আরে যাহ- সবই তো আগের মতোই রয়েছে! অবশ্য এসব ছাড়াও আরেকটা ব্যাপার, তুমি কিন্তু আমার অস্তিত্বেরই অংশ। ফলে আলাদা করে তোমাকে মিস করার দরকার নেই। আমি তোমাকে নয়, যেন আমাকেই মিস করি। আমার একটা ক্লোনবেবি, তাকে মিস করি। আজও পেট থেকে দীর্ঘ-কান্না উঠে এল। তোমার অফিসিয়াল চেক জমা দেয়ার জন্য যখন ব্যাংক বই বের করলাম। তুমি একটা কলম চেক বইয়ের পিঠে গেঁথে রেখেছ, যাতে কলম খুঁজতে গিয়ে কেউ হয়রানিতে না-পড়ে। এই যে কাউকে কষ্ট না-দেয়ার প্রবণতা, এটা হয়তো আমার কাছ থেকেই পেয়েছ। কিন্তু এজন্য তোমার কপালে অনেক দুঃখ আছে, বৎস! ব  আমি চিরকাল সবার সবকিছু বড় যত্ন করে আগলে রেখেছি। মানুষকে ভালোবেসেছি নিঃস্বার্থভাবে। কিন্তু ফলাফল শূন্য! মানুষেরা বড় আজব প্রাণী যারা ভালোবাসাকে দূর্বলতা মনে করে। মনে করে আরে, এই বান্দা তো ভারি ঠেকে আছে আমার কাছে। নইলে সে কেন এত খেয়াল রাখছে আমায়? বেশিরভাগ মানুষের কাজ হলো একেবারে সবুজ পাতায় আগুন ধরিয়ে তা তাঁরিয়ে তাঁরিয়ে উপভোগ করা। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা, কী করে আগুনের আগ্রাসী চলাচল পাতাটাকে নিঃশেষ করে দেয়? কাঁচাপাতার রস মজিয়ে আগুন ধেয়ে আসতে পাতার কতোটা কষ্ট হয়? শুকনোপাতার আগুন কিন্তু একেবারে অনায়াস। সে ধেয়ে যায় ব্যালে-ড্যান্সের ভঙ্গিতে, যেন সে ওই উত্তাপ খুব উপভোগ করছে! অথচ পাতা নিশ্চিত জানে, এটাই তার শেষ দিন। এরপর পাতাটির কংকালও আর পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবুও পাতা যেন তার মরে যাওয়া উপভোগ করতে করতেই ভষ্ম হয়ে যায়। আমিও জেনেছিলাম, এই যে অন্যের জন্য মায়াটায়া নিয়ে আমি আকুল হয়ে তাদের জন্য ভেবে মরি, এটাও পাতার জেনেবুঝে পুড়ে মরার মতোই একটা ব্যাপার ছিল। পুড়ে যখন চারপাশে ছাইয়ের ওড়াউড়ির মাঝে বিব্রত হয়ে উঠছি, তখন নিজেকে সামলে নিলাম। কী দরকার এত পরের কারণে নিজের স্বার্থ দিয়া বলী?

নিঃস্বার্থভাবে তুমি অনেক কিছু করে গেলে কেইবা তা বিশ্বাস করছে? এই জগতে দুটো বিষয় ঘটে, সব মানুষ সবকিছুই নিজের মতো করে ভেবে নেয়। দুই, মানুষের সেসব ভাবনা সব ক্ষেত্রে সত্য হয় না। যেমন আমি যা-ই করি না কেন, অন্যে ভাবে, না-জানি আমার কত স্বার্থ সেখানে জড়িয়ে রয়েছে। আদতে অন্যের কল্যাণ ভেবেই হয়তো আমি সেসব করি বা করতে চাই। বেশি উদার হলেও বিপদে পড়তে হয়। তুমি বেশি উদার হলে তোমার কাছ থেকে ফায়দা নেবে সবাই। আর যারা ফায়দা নেয় বা নেবে তারা ভাবে তুমি একবারে বোকার হদ্দ। এখানেও অন্যেরা ভুল করে ফেলে- এই বোকামিটা যে তুমি স্বেচ্ছায় করছ এমন তারা ভাবতেই পারে না বা ভাবতে চায় না। এই খেলাটা আমি বেজায় উপভোগ করি- অন্যেরা ভাবে, আমি কিছুই ধরতে পারি না বা বুঝতে পারিনা। আমি একটা বোকার হদ্দ! মজা কি জানো? কোনো লেখকই কোনোদিন অন্যের ধূর্তামি বুঝতে না-পারার মতো অতটা বোকা হয় না। যদি তা-ই হতো তাহলে বুদ্ধিবৃত্তির মতো পেশায় সে টিকতে পারত না। আমি বলতে চাই, লেখককে যে বোকা ভাবে, সেই আসলে সামান্য বোকা। লেখার মতো সংবেদনশীল পেশা কোনো বোকার জন্য নয়। একজন ভালো লেখক বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চৌকস হয়। অন্যদের চাইতে তার বুঝবার ক্ষমতা, দেখবার ক্ষমতা বেশি থাকে বলেই সে লেখার মতো দুরহ কাজ করে যেতে পারে।

আমি মনে করি, এই পৃথিবীতে সবচাইতে সম্মানিত ও সবচাইতে ধিকৃত পেশাটির নাম—লেখালেখি।

একজন মানুষের ভাবনাচিন্তা, মনোজগত, দেখবার ক্ষমতা, পড়াশোনার দখল সবই অন্যের কাছে নগ্ন হয়ে ওঠে শুধুমাত্র এই লেখালেখির মাধ্যমে।


969 Comments