ক্রিমসন রোজেলাকে ডাকে না-দেয়া চিঠি/৪ :: পাপড়ি রহমান



পাপড়ি রহমান

মুরগি তার ছানাদের কীভাবে খেতে দেয় বা খেতে শেখায় দেখেছ নিশ্চয়। দেখবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছানারা দূরে দূরে থাকে, তারা মায়ের কাছে ঘেঁষতে পারেনা সবলদের অত্যাচারে। মুরগি মা আর কী করে? হয়তো ওই দূর্বল ছানাটির দূরে থাকা সে খেয়ালই করে না। মানুষের বেলায় কিন্তু উল্টো ঘটনা ঘটে। যে শিশু দুর্বল, রোগে ভোগে বেশি তার প্রতিই মায়ের খেয়াল থাকে বেশি। যত্ন থাকে বেশি। আর বড় হয়ে সেই শিশুটিই হয়তো মাকে আঘাত করে বেশি। দুঃখ দেয় বেশি। আবার কিছু উলটো চিত্রও আছে। অনেক মা দুর্বলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বেশি। দুর্বলকেই দূরদূর ছাইছাই করে তাড়িয়ে দেয়। এই বিচিত্র পৃথিবীর নানান নিয়ম-অনিয়ম দেখে আমি মাঝে মাঝেই ভিড়মি খাই। মানুষের ভেদ কিছুই আমি বুঝি না।

বুঝি না, কোনো মানুষ কোনোদিনই কেন তার অন্যায় কাজগুলি দেখতে পায় না, বুঝতে পারে না। অন্যায়ের ওপর অন্যায় সাজিয়ে সে এক ক্ষণস্থায়ী প্রাসাদ গড়ে তোল ।এবং সেই প্রাসাদে আজীবন রাজাধিরাজ থাকার বাসনা পোষণ করে। সে দেখে না বা দেখতে চায় না, জানে না বা জানতে চায় না অন্যের বেদনার ভূমিটি এতে কতোটা বিস্তৃত হতে পারে। এরকম আত্মপর মানুষে ঠাসা আমাদের চারপাশ আর আমরা গুটিকয় মানুষ সেসবের অসহায় শিকার!

 বয়স বেড়ে যাওয়ার জন্য আজকাল বড় সমস্যায় পড়ে যাই, ধর, তোমার কথা মনে হলো আর আমি কেঁদে আকুল হতে থাকি। তখন হয়তো জনতাজর্জর রাজপথ, দুপুর বা সকালের রোদ লুটিয়ে রয়েছে হলদে ফুলেদের মতো। জানো তো, শীতকালের রোদ্দুরের রঙ হয় হলুদাভ অথবা কমলা ঘেঁষা। কারণ হিমের বৈয়ামের ঢাকনা সরিয়ে সূর্য কিছুতেই নিজের রূঢ় চেহারাটা বের করতে পারে না। ফলে তাকে কম আলো আর স্বল্প উত্তাপ নিয়েই খুশি থাকতে হয়। হলদে আলোর ভিতর আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরি। চশমা সংবেদনশীল মানুষের জন্য বড় আড়াল। পোক্ত আচ্ছাদন। চশমার কাঁচ আড়াল করে রাখে মানুষের যাবতীয় আনন্দ-বেদনার তরঙ্গ। ফলে হলদে বা কমলা রোদের ভিতর গড়িয়ে চলা রিকশা আমার মন খারাপের কারণে দিক ভুল করে ফেলে না বা কান্নার রেশটুকুও কেউ টের পায় না! আমি দিব্যি যেন কোথাও কিছু হয়নি এমন চেহারা করে ঘরে ফিরে আসি। অবাক ব্যাপার কি জানো, কাজেবাজে বেরোবার সময়ে তোমার বাবাও হয়তো আমার পাশে বসে থাকে, অথচ সে বুঝতেই পারে না আমি তোমার জন্য কেঁদেকেটে শত টুকরো হয়ে যাচ্ছি! চোখ থেকেও অন্ধ যারা, তারা কোনোদিনই তেমন করে কিছুই দেখতে পায় না।

দেখতে দেখতে আবার তোমার জন্মদিনের তারিখটি এসে গেল। এই দ্বিতীয়বার তুমি দূরে রইলে আমার কাছ থেকে। অবশ্য আমি মনে করি, তোমার সান্নিধ্যে কাটানো প্রতিটা দিনই জন্মদিনের আনন্দে ভরপুর।

তোমাকে কক্ষনো বলা হয়নি, তোমার জন্মদিনটি আমি কাটাতে চাই কোনো মনোরম পরিবেশে। ক্যান্ডেল-লাইট ডিনারও হতে পারে। অথবা কোনো বিচ-রেস্তরাঁয় লাঞ্চ খেতে খেতে আমরা বাতাসের শব্দ শুনতে পারি। দেখতে পারি, ঢেউয়েরা কীভাবে ছুটে এসে তটে লেগে থাকা পুরাতনী জলচিহ্ন মুছে দিয়ে যায়।

তবে আমি চাইব, যে বা যারা আমাদের লাঞ্চ পরিবেশন করবেন, তারা যেন সামান্য পৃথুলা হোন। ফ্রিল দেয়া গাউন আর টুপি পরে আমাদের জন্য হন্তদন্ত হয়ে সুপের বোল নিয়ে আসেন- যেমন দেখা যায় পুরানো দিনের হলিউডি সিনেমায়। খেতে খেতে তুমি আর আমি মিলে যেন আমাদের সকল গোপন কথা শেয়ার করতে পারি। জগতে এর চাইতে আনন্দ আর কি আছে- যে মানুষসিন্দুকে কথা জমা রাখলে তার ঢাকনা আর কোনোদিন খুলবে না! যে কথা ওই দুই মানুষ ছাড়া আর কেউ কোনোদিন জানবে না। এমন বন্ধু হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তোমরা যখন বড় হলে আমি তেমন বন্ধুই পেলাম। অথচ এর আগে যাদের বন্ধু ভেবেছি, তারা আমায় বেল্টের তলা দিয়ে ছুরি মেরে চলে গিয়েছে। তখন থেকেই আমি জানি, এ জগতে সত্যিকার বন্ধু পাওয়া বড় দুস্কর। আপনজন পাওয়া বড় ভাগ্যের ব্যাপার।

এ জন্মদিনে তোমাকে বলার মতো একটা কথাই আমার রয়েছে- কোনোকিছুতেই মেজাজ চরম খারাপ করবে না। যে কোনো অবস্থায় নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই তুমি সবকিছু জয় করতে পারবে।

ক্রোধের চাইতে বড় শত্রু আর কোনো কিছুই নেই।


2,175 Comments