গাঁথার বসন্তকালীন আসর :: কামরুল হাসান



কামরুল হাসান

আমি যখন গাঁথার স্বরচিত পাঠের আসরে পৌঁছালাম তখন গাঁথার কুড়িজন সদস্য ঘর আলো করে বসে আছেন। মনে পড়ল কবি নির্মলেন্দু গুণের সেই বিখ্যাত পঙক্তি ‘আমি যখন বাড়ি পৌঁছলাম তখন দুপুর।’ না, আমার মাথার উপর কোন হুলিয়া নেই, কোন শিকারী পুলিশব্যাঘ্রের ভয়ে আমি এই হরিণীবনে ঢুকিনি। আমি এসেছি প্রাণের টানে, গাঁথার অযুত প্রাণের সাথে নিজের প্রাণটি গাঁথতে। পুরুষ বলে সেই শতভাগ নারী লেখকদের সংগঠনে আমি সদস্য হতে পারবো না, সে মুহূর্তে শতভাগ নারী আসরে একমাত্র পুরুষ ছিলাম আমি। পরে অবশ্য আরো চারজন এলেন, তবে আমরা সংখ্যালঘু হয়েই থাকলাম, বাইশের বিপরীতে সাত। আমাদের ভূমিকা শ্রোতার।

উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত কক্ষটির দক্ষিণ দেয়ালে একটি ব্যানার। তাতে লেখা বসন্ত মুখর আজি। বসন্ত যে মুখরিত তা বোঝার জন্য ঐ ব্যানার না পড়লেও চলে, বসন্ত সাজে সেজেছে গাঁথার নারীরা। পহেলা ফাল্গুনের পরদিনই ভালোবাসা দিবস, হলুদের পরপরই লাল। ইএমকে সেন্টারের দশতলার এই কক্ষটিতে হলুদ-লালের ছড়াছড়ি। সেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম কবি ফেরদৌস নাহার, যিনি অনেক অর্থেই ব্যতিক্রম, তার কবিতায়, তার জীবনধারায়। তিনি বাস করেন প্রবাসে, আজকের আসরে উপস্থিত একমাত্র প্রবাসী কবি। তিনিই যে আজকের আসরের মধ্যমনি সেটা জানলাম অনুষ্ঠানমালার একেবারে শেষে এসে।

দক্ষিণ দেয়ালের ঐ ব্যানারের নিচে তিনটি কালো রঙের চেয়ার, হলঘরে শ্রোতাদের বসবার চেয়ারও হুবহু এক। সমুখের চেয়ারগুলো আলাদা হয়েছে তাদের আলাদা রূপে নয়, স্থানিক অবস্থানের গুণে। সমুখে একটি নিচু টেবিল, তাতে ফুল সাজানো। গাঁথার অনুষ্ঠানে জাকজমক নেই, আছে সুচারু শিল্প, ঐ ফুলদল যার প্রতীক।

গাঁথার প্রতিটি অনুষ্ঠানের দায়িত্ব চক্রাকারে কোনো একজন সদস্যকে দেওয়া হয়। বসন্তের স্বরচিত পাঠের আসরটির দায়িত্বে ছিল সালমা তালুকদার। বেরসিক অসুখ সুরসিক মানুষটিকে আসতে দেয়নি। তার ভূমিকাটি পালন করলেন লায়লা মুন্নী। গাঁথার সভাপতি কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান লেখালেখিতে যেমন সংযমী, কথা বলায়, বিশেষ করে মঞ্চে এসে কথা বলায়, তেমনি সংযমী। আড্ডায় প্রাণবন্ত হলেও শ্রোতাসম্মুখে তাকে আড়ষ্ট মনে হয়। ‘এরচেয়ে সহজ লেখা’- মনোভাবে তিনি স্বাগত জানান সবাইকে। বাংলা কবিতার এক মহীরুহ কবি আল মাহমুদ আজই পরলোকে যাত্রা করেছেন। তাঁর প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা জানালেন পাপড়ি রহমান। সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে তিনি একজন শক্তিমান কবি ও কথাসাহিত্যিক একথা বল্লেন। অতঃপর যারাই নিজ লেখা পাঠ করতে এলেন, শ্রোতাদের শুভেচ্ছা জানানোর পর তাদের প্রথম বাক্য হয় আল মাহমুদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। একে বলা যেতে পারে ট্রেনের বগিদের ইঞ্জিন অনুসরণ।

গাঁথা সময় মেনে চলতে চায়। চারটা মানে চারটা। আজ অবশ্য পশ্চিমাকাশে হেলেপড়া সূর্যের মতো ঘড়ির কাঁটা চার ছাড়িয়ে পাঁচের দিকে হেলে পড়লে অনুষ্ঠান শুরু হলো। তিন চেয়ারের জন্য প্রথমেই ডাকা হলো তিন সিনিয়রকে। এরা হলেন দিলারা মেসবাহ, মালেকা ফেরদৌস ও উম্মে মুসলিমা। এরা তিনজনই একাধারে কবি ও কথাসাহিত্যিক। বস্তুত গাঁথার বেশিরভাগ সদস্যই গদ্য ও পদ্যের দ্বিধারায় লেখেন, তবে তারা দ্বিধাগ্রস্ত নন। যখন যে তলোয়ার প্রয়োজন তারা তখন সেটাই বের করেন, সেসবের দীপ্তি শ্রোতাকে উদ্দীপ্ত রাখে।

আমি ভেবেছিলাম আজকের অনুষ্ঠানের এরাই সভাপতি, প্রধান ও বিশেষ অতিথি। সেরকম কোনো ঘোষণা না আসায় সভাপতি কে হতে পারেন মনে মনে সেই জল্পনা করি। প্রথমেই এলেন দিলারা মেসবাহ। তিনি তিনটি কবিতা পড়লেন। প্রথম কবিতা আল মাহমুদকে উৎসর্গীত। দ্বিতীয় কবিতা ‘জলের কাছে যাও’ যেখানে একটি পঙক্তি আছে ‘ডাঙ্গার ভালোমন্দ না বোঝাই ভালো’। তার ব্যক্তিত্বের মতোই নরোম ও অনুভূতিসম্পন্ন কবিতা, গলায় পরে থাকা সাদা পুতির মালার মতো শব্দের মালা গেঁথেছেন, তাতে জল, জমি, কচুরিপানা, আকাশমনি, গেরস্থভিটা, গ্রাম- সবই আছে। ভূমিকায় তাকে নিভৃতচারী লেখক বলেছিলেন পাপড়ি রহমান। আসলেই তাই, তার কবিতা ভালো, কিন্তু তিনি নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করেন।

আমি ভেবেছিলাম বসন্তের এই আসরে কেবল কবিতা পাঠ হবে, কিন্তু উম্মে মুসলিমা যখন গল্প পড়তে শুরু করলেন তখন ভালো করে ব্যানারের দ্বিতীয় লাইনটি পড়লাম। সেখানে লেখা ‘স্বরচিত পাঠ’; ‘স্বরচিত কবিতা পাঠ’ নয়। দিলারা মেসবাহ ও উম্মে মুসলিমা দুজনেরই একটু বিলম্বে সাহিত্যভুবনে পদার্পণ । উম্মে মুসলিমার ছোটোগল্প ‘অভিজাত’ এক ট্রেনযাত্রার বিবরণ। নিজেকে জাহির করতে উন্মুখ এক সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী যখন দেখলেন তার সহযাত্রী বয়স্ক নারী তার স্বামীর চেয়েও উঁচুপদে আসীন, তখন সে বুঝতে পারলো বাইরে থেকে মানুষের সঠিক পরিচয় বোঝা যায় না, আর ঐসব আত্মপ্রচার, আভিজাত্য প্রদর্শন অর্থহীন। সরল গল্পটি শ্রোতাদের বাহবা পেল, গল্পের একটি কৌতুককর অংশের শ্লেষে হেসে উঠলো সবাই। উম্মে মুসলিমা শব্দচয়নে বেশ কুশলি, সাধারণ ঘটনাকেও তিনি গাল্পিক আবহে নিয়ে আসতে পারেন। লক্ষ্য করে দেখলাম তার দুজন সঙ্গীর বিপরীতে তিনি তার গল্পের প্রধান চরিত্রের মতোই অভিজাত, কিছুটা পাশ্চাত্য ধাচের পোষাক পরে আছেন। আমার পাশে বসে থাকা সেঁজুতি বড়ুয়া বল্ল, উম্মে মুসলিমার ঐ স্মার্টনেস তার লেখার মতোই সেঁজুতির ভালো লাগে।

মালেকা ফেরদৌসও একজন নিভৃতচারী কবি। তার ছয়টি কাব্য বেরিয়েছে। সেসব থেকে তিনটি কবিতা পড়লেন। তারও প্রথম কবিতা আল মাহমুদকে উৎসর্গীত। এর নাম ‘তোমাতেই ফিরি বারবার’। আল মাহমুদ বারবার ফিরে আসার মতো কবি, তবে তাঁকে অনূসরণ করা শক্তির কাজ। মালেকা ফেরদৌসের কবিতাকে আমার বরঞ্চ কিছুটা রাবীন্দ্রিক ধাঁচের মনে হলো। তার দ্বিতীয় কবিতার একটি পঙক্তি ‘চিঠি খুলতেই নদী আছড়ে পড়লো আমার জানালায়’ দারুণ চিত্রকল্প তৈরি করলো। ‘সেই পাখি দুটো’ ও ‘তোমাকে দেখার জন্য ‘ শিরোনামের আরও দুটি ছোট কবিতা তিনি চমৎকারভাবে পাঠ করলেন। ঐ তিন লেখক যখন মঞ্চ ছাড়লেন, তখন ‘কে হবেন সভাপতি’ ধাঁধা কেটে যায়। বুঝলাম আজ যে পনেরজন কবিতা বা গল্প পড়বেন তারা তিন পাঁচে পনের হয়ে পাঁচবার তিন চেয়ারে গিয়ে বসবেন। তাদের রজনীগন্ধা স্টিক দিয়ে বরণ করে নেবে গাঁথার কোন নবীন সদস্য, লায়লা মুন্নীকে আরো বারোবার এসে লেখদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে লেখা পড়ার আহবান জানাতে হবে।

দ্বিতীয় তিনে এলেন শাহনাজ নাসরীন, জুনান নাশিত ও আয়েশা ঝর্না। কীর্তিমান দশ নারীকে নিয়ে এবার বইমেলায় একটি জীবনীগ্রন্থ এসেছে শাহনাজ নাসরিনের। বলা ভালো গাঁথা মূলত নারীবাদী লেখকদের সংগঠন। বারো বছর আগে অধ্যাপক নিয়াজ জামানের হাতে প্রতিষ্ঠিত গাঁথার মূল লক্ষ্য নারী লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা ও জাগ্রত করা। নারীবাদী হলেও গাঁথা পুরুষবিদ্বেষী নয় ( উদাহরণ আমি সেখানে আছি এবং আমার মতো আরো পুরুষ লেখকগণ ) জুনান ও আয়েশা প্রধানত কবি হলেও নাসরিন প্রধানত গল্পকার। তার ‘নায়িকার একদিন’ গল্পের নায়িকার শ্যুটিংস্পটে এক অলস সকালের গল্প। বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করলেও সে এসেছে একটি আর্ট ফিল্মে অভিনয় করতে কেননা ‘টাকাপয়সার টানাটানি থাকলেও এসব ছবি থেকেই খ্যাতির পালকগুলো জোটে।’ দেরি করে ঘুম থেকে উঠে সে হাঁটতে বেরুয় ঐ রাতের পোষাক পরেই। তার রূপসৌন্দর্য এমনিতেই লোকদের মনোযোগ সৃষ্টি করে, এরপরেও সে একটি বানরকে চারটি কলা খেতে দেয় চারপাশে ভীড় বাড়াতে। সবজিক্ষেত থেকে মফস্বল শহরটির বিপনিবিতান পর্যন্ত তার ঘুরে বেড়ানো লেখকের কলমে ঘুরে বেড়ায়। গল্পটিতে কোন উত্তেজনা বা ক্লাইম্যাক্স নেই। এটি শেষ হয় নিরুত্তাপভাবে।

জুনান নাশিত বেশ লাজুক প্রকৃতির, পাপড়ি রহমানের মতোই কিছুটা অপ্রতিভ। এমনিতেই তার কণ্ঠস্বর নিচু, মাইক্রোফোনটি মুখ থেকে দূরে রাখায় সেই স্বর ফুটল না, যে স্বর শ্রোতাদের জাগিয়ে তুলতে পারতো। ঘরটি তত বৃহৎ নয় বলে আর শ্রোতৃমণ্ডলি ঘনিষ্ঠ থাকায় অবশ্য শোনা গেল। তিনি তার প্রথম কাব্য থেকে দুটি আর গ্রন্থভুক্ত হয়নি এমন একটি কবিতা পড়ে শোনালেন। বাবাকে নিয়ে লেখা ছোটো কবিতাটির একটি পঙক্তি এরূপ : ‘আমার বাবা একলা দাঁড়ান অন্ধকার বারান্দায়।’ দেয়ালে ইএমকের বড় লোগো, রোস্ট্রামে ছোটো লোগো এসে যায় যখনই ছবি তুলি। আমি ছাড়া ছবি তুলছে সুলতানা ফেরদৌসি ও পাপড়ি রহমান। সুলতানা ফেরদৌসিকে মনে হলো গাঁথার অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার। ট্যাবকে মনে হয় ছোটোবেলার শ্লেটের মতো, দেখি এক ফর্সা দীর্ঘাঙ্গীনি দৃশ্যের দিকে শ্লেট তুলে ধরেছে। এরপরে কবিতা পড়লেন আয়শা ঝর্না। একটি বিষয় খেয়াল করলাম জুনানের তিন কবিতার একেবারে শেষে করতালি বাজালো শ্রোতারা, মাঝে একবারও নয়। অন্যদিকে আয়শা পঠিত প্রতি কবিতাতেই করতালি। এর কারণ যা বুঝলাম তা হলো দুই কবিতার মাঝে বিরতি, জুনান যা দেয় না, এক কবিতা থেকে প্রায় না থেমেই চলে যায় অন্য কবিতায়। দ্বিতীয় কারণ আয়শার কবিতায় চিন্তার বৈচিত্র্য দেখা যায়। ‘এ শহর আমার নয়’ কবিতায় আয়শা বলেন ‘শিশুর জন্য নেই তো কোন মাঠ’। দ্বিতীয় কবিতা ‘থেরিবাঁধা’ বৌদ্ধ ভিক্ষু হতে ইচ্ছুদের নিয়ে রচিত।

পশ্চিমের জানালা দিয়ে সূর্যকে দেখা গেল চাঁদের মতো, মেঘেরা যার কেশর খেয়ে ফেলেছে। বেলা পাঁচটায় মেঘের গ্রাস ছেড়ে সূর্য বেরুল, কক্ষে ছড়িয়ে পড়লো মিষ্টি রোদের ঝিলিক। এমনি সময় সভাস্থলে পরপর এসে হাজির হলেন কবি শাহেদ কায়েস ও কথাসাহিত্যিক নুরুল করিম নাসিম। পরের তিন আমন্ত্রিত কবি হলেন সাবেরা তাবাসসুম, সেঁজুতি বড়ুয়া ও আফরোজা সোমা। যৌনকর্মীদের নিয়ে রচিত তার কাব্য ‘সহোদরা’র চারটি পর্ব থেকে চারটি কবিতা পড়লেন তিনি। সময় পাঁচ মিনিট বেঁধে দেয়া হলেও চার কবিতা পাঁচ মিনেটে আঁটলো না, দশ মিনিট ছাড়িয়ে চলে গেল বারোর ঘরে। যৌনবৃত্তিতে যারা জীবিকার জন্য নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়েছে তাদের নিয়ে লেখা সাহসী কবিতাগুলো ডিন্নস্বাদের। যেমন দ্বিতীয় কবিতা ‘মন অন্য নয়’ শুরু হলো আঞ্চলিক গান দিয়ে। ‘সবাই কামুক’, ‘মিলনে কী সুখ’, ‘উঁচু বুক খোঁজে তারা’, নাচের চেয়ে বেশি দেখে প্রিন্সেস তমার শরীর’ জাতীয় সাহসী পঙক্তি স্বাভাবিক নিয়মেই সাবেরার কবিতা চলে আসে।

সেঁজুতি বড়ুয়া গাঁথার সদস্য নয়, সে এসেছে আমন্ত্রিত হয়ে। সেঁজুতি সুস্পষ্ট উচ্চারণে ‘আশ্চর্য রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত’, ‘আফশোস কিছুই হলো না’ ও ‘এই যে সমুদ্র আপনার জন্য’ শিরোনামের তিনটি কবিতা পড়ল। সেঁজুতির কবিতাগুলোর ভেতর গল্প রয়েছে, রয়েছে প্রেম ও মানব প্রকৃতি। আফরোজা সোমা গুমখুন নিয়ে রচিত তার ছোটোগল্প ‘ঘ্রাণ’ পাঠ করলো। সুস্পষ্ট তার উচ্চারণ, তবে গল্পটি যেরকম টানটান বিষয় নিয়ে রচিত তেমন তীব্রতা বা প্রখরতা গল্পটির বুননে ফুটে উঠলো না। সেই যে মেঘের ঘেরাও ভেঙে সূর্য সিংহের মতো বেরিয়ে এসেছিল বেলা সাড়ে পাঁচটায় সে আবার তার কেশর হারিয়ে লাল চাঁদ হয়ে উঠলো।

সময় ফুরিয়ে আসছিল, রাফিয়া আবেদীন দুটি, সুলতানা ফেরদৌসি দুটি, আফরোজা টিনা একটি কবিতা পাঠ করেন। অনেকগুলো বাংলা কবিতাপাঠ শেষ হলো একটিমাত্র ইংরেজি কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে। প্রত্যেক কবি বা গল্পকারকে ফুল দিয়ে সম্বর্ধনা জানানো হলো। ফুল দিয়েছে গাঁথার কয়েকজন ফুলের মতো সুন্দর সদস্য। এরা হলেন জাফরিন লিয়া, আফরোজা আকতার টিনা ও পারভীন রহমান।

অনেকদিন পরে বিদেশে বিদেশে থাকা শাহেদ কায়েসকে দেখে আমি যারপরনাই আনন্দিত। সে আনন্দ প্রকাশ করতে আমি শাহেদের পাশে গিয়ে বসি। সেখানে ছবি তুলছিল আফরোজা আখতার টিনা। এরপর নাসিম ভাই এলে তার পাশে চলে যাই। এ বইমেলায় প্রকাশিত তার ‘নির্বাচিত কবিতা’ বইটি দিয়ে নাসিম ভাই চলে যান। অন্য কোন টানে নয়, তিনি এসেছিলেন আমাকে বইটি দিতে।

কবি ফেরদৌস নাহারকে বাংলা কবিতার সম্পদ বলে অভিহিত করলেন পাপড়ি রহমান। তাকে পুরো কুড়ি মিনিট সময় দেওয়া হলো কবিতা পড়ার জন্য। আয়োজকদের ইচ্ছা ছিল পূর্ণ ত্রিশ মিনিট। কেন তাকে অতখানি সময় দেয়া হচ্ছে তা শ্রোতারা অনুধাবন করবেন ফেরদৌস নাহারের কবিতা শুনলে।

‘শোক জানাতে চাই না। অনেক দূরে থাকি, সেই তীব্রতা থেকে বলি ভালোবাসা গ্রহণ করুন’ ফেরদৌস নাহারের কথা মুগ্ধকর। তার প্রতি প্রকাশিত ভালোবাসা ও সৌজন্যবোধের জন্য গাঁথার সদস্যদের ধন্যবাদ জানালেন। ‘আমি অমাইক (অমায়িক) তাই আমার কোন মাইক লাগবে না’- বলে তিনি মাইক্রোফোন সরিয়ে রেখে তার কবিতা পড়তে লাগলেন তন্নিষ্ঠ হয়ে। তার ঝাঁকড়া চুল, শিশুসুলভ অবয়ব এমনিতেই তাকে আলাদা করে। কবিতা পড়ার ভঙ্গিটিও আলাদা। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় gesture, সেই হাতের দৈহিক ভাষাটিও নান্দনিক।
তিনি বুঁদ হয়ে, হাত ঘুরিয়ে একে একে তার সর্বশেষ কবিতাগ্রন্থ ‘রূপান্তরের ঘোড়া’ থেকে প্রথমে পাঠ করলেন হরিণীর জাদুবিদ্যা, শেষে ‘দুঃখ’, যার দুটো লাইন ‘কোথায় দুঃখের বাড়ি/কোন স্টেশনে তার চলাচল।’

অনুষ্ঠান শেষে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে পাপড়ি রহমান ক্ষণিক বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে আসামাত্র সবাই তাকে উদ্দেশ্য করে জোরে করতালি দিল, যেন স্বাগতধ্বনি। তিনি একটু হতবাক। যখন জানলেন কারণটা তখন একটু সলজ্জভাবেই এ বইমেলায় তার নতুন উপন্যাস ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’র প্রেক্ষাপট, চার বছর ধরে লেখার তিতিক্ষা, কীভাবে লিখেছেন ইত্যাদি জানালেন। গাঁথার পরবর্তী অনুষ্ঠান হবে মার্চের ৯ তারিখ। চাপানের আগে একটি দলবদ্ধ ছবি তোলা হলো। ভেজিটেবল রোল, কাচাগোল্লা সহ চা। যখন বেরিয়ে আসি তখন ছবি তোলার একটি হিড়িক পড়েছিল, বিশেষ করে ফেরদৌস নাহারকে ঘিরে, আজকের অনুষ্ঠানে সেলিব্রিটি যিনি। সেখানে যোগ দিব কী প্রকারে? আমার মোবাইলের ব্যাটারি ততক্ষণে নিঃশেষিত।


1,707 Comments