গাঁথার মিলন মেলায় বিশ্ব সাহিত্য :: সুলতানা ফিরদৌসী



নতুন বছরের প্রথম সময়ে গাঁথা সাজিয়েছে এক নতুন আলোর যাত্রা। নতুন মাত্রার উদ্যোগে কর্ম উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে দিনটি উদ্ভাসিত হয়েছে বিশ্ব সাহিত্যের জন্য। এতো ছোট পরিসরে বড় ভাবনার জন্য সৎ সাহস লাগে, গাঁথার সেটা আছে। আমরা বিশ্বাস করি সেই সাহস সরবরাহ করে আমাদের সুপ্রিয় সদস্যরা। এমন পথ বেয়ে আপামর পাঠক এবং লেখকের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে অসাধারণ কিছু নারী শক্তি নিয়ে চলছে গাঁথার নিয়মিত অনুষ্ঠান।
এমিলি এলিজাবেথ ডিকিনস বিখ্যাত মার্কিন কবি এবং সিলভিয়া প্লাথ ছিলেন একজন কবি ও গল্প উপন্যাস লেখক, তিনি  সাহিত্যে প্রথম মরণোত্তর পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। অন্যদিকে ডিকেনসন উনিশ শতকের বিখ্যাত মার্কিন কবি।কাকতালীয় ভাবে দুজনের জীবন উপলব্ধি অনেকটাই এক রকম! ভীষণ মিল খুঁজে পাই, দুজন কবি ব্যক্তি জীবনে হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত, একাকী, নিঃসঙ্গ বিষাদের ছায়া যেন কবিতায় আছড়ে পড়েছে, তবে সেই আশ্চর্য বিষাদ ছুঁয়েছে তাদের সাহিত্য। দুঃখকে শক্তিশালী এবং চর্চা করেছেন, তাদের কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেক অংশগুলো নিবিড়ভাবে মৃত্যু, দুঃখ, হতাশা, একাকী নিঃসঙ্গ বিষাদের সুর কবিতায় আছড়ে পড়ছে।

মার্কিন কবি এমিলি ডিকিনসন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্য আমহার্স্টে জন্ম গ্ৰহন করেন। উনিশ শতকের বিখ্যাত কবি হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। তিনি ঐ সময় সমাজের স্বনামধন্য পরিবারে জন্ম গ্ৰহন করেন, সাদা রঙের গোলাপ তার খুব পছন্দ। তবে তাঁর বেশীরভাগ সময় একাকী, নিঃসঙ্গ অবস্থায় কেটেছিল। এমিলি এলিজাবেথ ডিকিনস, দুঃখ কে নিজস্ব করে নিয়েছিলেন, কষ্টকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন জীবন ভর।
যন্ত্রণায় ছটফট করে নিজের সত্তাকে বারবার খুঁজেছেন। একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, এমিলি এলিজাবেথ ডিকিনস ছিলেন তার সময়ের চেয়ে অগ্রসর একজন কবি, তিনি বিরল প্রতিভার অধিকারী নারী  অন্তর্মুখী স্বভাবের কবি। অথচ তার রচিত আঠারোশো কবিতার মধ্যে মাত্র এক ডজনেরও কম কবিতা তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়। তার লেখা কবিতাগুলো প্রকাশকরা প্রচলিত কাব্যভাষার  নি‌য়ম নীতির মধ্যে আনতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে পাল্টে ফেলেছিলেন। যে সময় তিনি কবিতা লিখতেন সে সময়ের  অবস্থায় কবিতাগুলো একবারে ভিন্নধর্মী ছিল।তার লেখা কবিতাগুলো স্বল্প বাক্যে রচিত, চমৎকার একটি অংশ, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, শিরোনামহীন, প্রায়শই তিনি তীর্যক চরণের ব্যবহার করতেন সেই সাথে অপ্রচলিত শব্দের কাজ তার কবিতায় আছড়ে পড়ে; তিনি তার কবিতায় বড় হরফের ব্যবহার করতে থাকে এবং বিরাম চিহ্নসম্বলিত। তার কবিতায় মৃত্যু বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করে। ১৮৮৬ সালে তার মৃত্যুর পর উনার ছোট বোন লাভানিয়া তার কবিতার ভান্ডার আবিষ্কার করেন, এর আগে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় নাই।

ডিকেনস জীবন কাটান একান্ত নিরিবিলি পরিবেশে,চিরকুমারী এই কবি নিজের জীবনের প্রতি খুব উদাসীন হয়ে থাকতেন। বন্ধুত্ব তিনি চিঠি আদান প্রদানের মাধ্যমে করতেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি সন্ন্যাসী হয়ে কাটিয়েছেন।
ডিকেন্সের ভ্রাতৃবধু সুসান গিলবার্ট এর সাথে ভালো বন্ধুত্ব ছিল, কবি তাকে ৩০০শর উপরে চিঠি আদান প্রদান করেন। তার পরামর্শ কবি কিছু টা শুনতেন। এরপর কবির মা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাকে দেখভাল করার দায়িত্ব পালন করেন কবি, সেই  সময় কবি সৃষ্টিশীল জীবন আর মৃত্যুর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান। ১৮৮৬ সালের ১৫ই মে ৫৫বছর বয়সে দীর্ঘ কান্নার বিষাদময় সময় পার করে মৃত্যু বরণ করেন। দিনটি ছিল অদ্ভুত। কবি ব্রাুইটস রোগে ভুগে ছিলেন আড়াই বছর।
কবি সিলভিয়া প্লাথ ১৯৩২ সালে বোস্টনে জন্ম গ্রহণ করেন। সিলভিয়া প্লাথ প্রতিভাময়ী কবি, গল্প, ঔপন্যাসিক হিসেবে কাজ করেন। তার মানসিক অস্থিরতার কারণে দুঃখী আত্মা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিজস্ব ভাবনায় আলোকিত হয়ে যায়, তখন সবাই অবাক হয়ে যায়। জীবন কে নিয়ে এতো হেলাফেলা! এভাবেই নষ্ট করে দিল নিজের জীবন; তার প্রায় কবিতায় যন্ত্রণা দৃশ্যমান উল্লেখ করা যেতে পারে।
“বাঁচতে ইচ্ছে করে সব রং আলো ছায়া
রস, রূপ, সুরভী নিয়ে। যত রকম মানসিক আর শারীরিক অস্তিত্ব সম্ভব
সব টুকু শুষে নিয়ে যেন সোচ্চারে বাঁচি।
কিন্তু আমার যে কী নিদারুণ সীমাবদ্ধতা।”
সিলভিয়া প্লাথ প্রতিভাময়ী অসাধারণ একজন মানুষ হিসেবে এসেছিলেন পৃথিবীতে, স্বাভাবিক মৃত্যু হলে এতো খারাপ লাগতো না, তার চলে যাওয়া খুব ট্রাজেডিতে ভরা। স্কুলের পাট চুকিয়ে স্মিথ কলেজ থেকে সর্বোচ্চ সন্মান নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন, তিনি ১৯৫৬ সালে বিয়ে করেন কবি টেড হিউজ কে। দুটি ফুটফুটে ছেলে মেয়ে হয়, কিন্তু হতাশা তার জীবনের সবচেয়ে স্মরনীয় ঘটনা।  দুঃখ তার সর্বাধিক সংগী;এর মধ্যে তার লেখা চলছে, হঠাৎ আবিষ্কার করেন কবি, তার স্বামী চলে গেছেন অন্য নারীর সঙ্গে। জীবন ভুলের চোরাবালিতে যেন পড়ে যায়। কবি তার মাকে লিখেছিলেন-
“সারা পৃথিবী আমার পায়ের নিচে,
ফেটে চৌচির, যেন পাকা রসালো ফল তরমুজের লালিমা, ভেবেছিলাম এক চিরন্তন বিস্তৃতি মাত্র।”

সিলভিয়া প্লাথ এর কবিতায় এসেছে নানা চিত্র কল্প, চাঁদ, রক্ত, বেদনা ও হাসপাতালের গন্ধ, ভ্রুন, করোটিসহ বিভিন্ন ধরনের আয়োজন।  সিলভিয়া প্লাথ এর কবিতায় ডিলান টমাস, ইয়েটস,মারিয়ানা মূরের প্রত্যক্ষ প্রভাব! তিনি ইংরেজি সাহিত্যের চির নজরুল, ১৯৬০ এরপর কবিতায় আছড়ে পড়ছে নিসর্গ চিত্র সঙ্গে বন্দী দশার অব্যক্ত যন্ত্রণা আর মৃত্যুর নিঃশব্দ পদচারণা।
আসলে সিলভিয়া প্লাথ এর জীবন ছিল জটি। কবির রোজনামচার ছেঁড়া পাতায় যে কথামালা আছে তা শুধু কষ্ট
অস্থিরমনা এক যুবতীর। প্রচন্ড প্রতিভার অধিকারী অথচ বেখেয়ালি মনের এই কবি। যার কবিতা জীবনের কথা বলে না, মৃত্যুর কথা বলে।
১৯৬৩ সালে তিনি গ্যাস এর চুলায় মুখ ঢুকিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করেন। আবারও উল্লেখ করছি সিলভিয়া প্লাথ পুলিৎজার পুরস্কার পান তার মৃত্যুর উনিশ বছর পর ১৯৮২সালে যার সম্পাদনা করেছেন স্বয়ং টেড হিউজ! যা ইংরেজিতে লিখিত বিশ শতাব্দীর সর্বাধিক বিক্রিত কবিতার সংকলন একটি।

অনুষ্ঠানে আলোচক  হিসেবে উপস্থিত ছিলেন~
ড.মোঃ মোহসিন রেজা
আফরোজা পারভীন
আয়েশা ঝর্না
টানটান আলোচনার মাঝাখানে ছিল কবিতা আবৃত্তির  আয়োজন। আলোচনা থেকে আমরা বিস্তারিত তথ্য জানতে পারি। অনুভব করতে পারি উল্লেখিত কবিদের কবিতা তাদের যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে এসেছে, বিষাদ ও যন্ত্রণা তাদের মূল শক্তি, লেখক প্রয়াস।
আমন্ত্রিত অতিথিরা মন ভরে আলোচনা শুনছিল, এটাই গাঁথার সাফল্য। আফরোজা আক্তার টিনার চমৎকার উপস্থাপনা অনুষ্ঠানটিকে সুন্দর করে তোলে। গাঁথা সাহিত্য সংগঠন হিসেবে কাজ করলেও কিছু নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, হয়তোবা সেই কারণে ফুলের ব্যবহার করে থাকে যা পরিবেশকে সৃষ্টিশীল করে তুলে।
পরবর্তী অনুষ্ঠান ঘোষণা করেন ইশরাত তানিয়া। পরিশেষে চা চক্রের আহ্বান, ছবি তোলা সহ বিভিন্ন আলাপ করে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
সুলতানা ফিরদৌসী
  • IMG_20190203_160908_023.jpg
    104.3kB


1,286 Comments