জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নারী



হেমন্তের আশ্বাসে এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে… মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার… চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ…

হেমন্তে অবসাদ, হেমন্তেই নিস্তেজ মাঠে নরম উৎসব। হেমন্তে তাই গাঁথার আয়োজন ‘জীবনানন্দের কবিতায় নারী’। হাজার বছর ধরে অনন্ত যে পথে হেঁটেছেন কবি, সে পথের নাম পৃথিবী। ক্লান্ত প্রাণ সে পৃথিবীর পথে একদণ্ড শান্তি পেয়েছিল নারীর কাছে। কারা সেই নারী? বনলতা, সুদর্শনা, সুরঞ্জনা, সুচেতনা, সুজাতা… কেমন করে একজন আধুনিক কবি’র মনন ও মস্তিষ্ক নারীকে উপলব্ধি করেছে? নারী কি শুধুই দেবী, স্বপ্ন-সখা? নাকি মানুষের ভীড়ে তিনি নারীকে দেখেছেন বাস্তবতার এক মানুষ হিসেবেই? ২০ অক্টোবর গাঁথার আয়োজনে জীবনানন্দের কবিতায় নারীদের সেই বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করেছেন বিশিষ্ট তিনজন কবি- ফরিদ কবির, তুষার কবির এবং সাকিরা পারভীন।

তুষার কবির

কবি তুষার কবির বলেন জীবনানন্দের কাব্যমানসে অনেক নারী চরিত্র এসেছে। নারীকে সম্মোধন করে তিনি কবিতা লিখেছেন। সুরঞ্জনা আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো… শ্যামলী, তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতো… সবিতা, মানুষ জন্ম আমরা পেয়েছ… সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ… সুদর্শনা, তুমি আজ মৃত… জীবনানন্দের কাব্যমানসে এরকম অনেক নারী চরিত্র এসেছে। তিনি মূলত বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন। কারণ, ত্রিশের দশকে নারীর নাম দিয়ে বইয়ের নামকরণ একটি দুঃসাহসী পদক্ষেপ বলে তিনি মনে করেন।

তিনি জানান, বনলতা সেনের দুটি সংস্করণ হয়েছিল। প্রথমটি কবিতা ভবন সংস্করণ যেটা এক পয়সায় এক সিরিজের পুস্তিকা ধরণের বই। জীবনানন্দ দাশ নিজ খরচে প্রথম বনলতা সেন প্রকাশ করেছিলেন। সিগনেট সংস্করণ ছিল বর্ধিত আকারে। বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের রিভিউতে বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশকে নির্জনতম কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এছাড়াও কবি সুকুমার সেন এই কাব্যগ্রন্থকে জীবনের শ্রেষ্ঠতম রচনা হিসেবে অভিহিত করেন। দীপ্তি ত্রিপাঠী’র উদ্ধৃতি দিয়ে কবি তুষার কবির বলেন- ইতিহাস চেতনা, টাইমলেসনেস আর টেম্পোরালের সমন্বয় কবিতাটিকে মহাকাব্যিক করে তুলেছে। তিনি ক্লিনটন বি সিলির ‘এ পোয়েট এপার্ট’ গবেষণা গ্রন্থ থেকে বনলতা সেন কবিতার ইংরেজী অনুবাদ পাঠ করেন।

For thousands of years I roamed the paths of this earth,

From waters round Sri Lanka, in dead of night, to seas up the Malabar Coast.

Much have I wandered. I was there in the gray world of Ashoka

And of Bimbisara, pressed on through darkness to the city of Vidarbha.

I am a weary heart surrounded by life’s frothy ocean.

To me she gave a moment’s peace—Banalata Sen from Natore.

Her hair was like an ancient darkling night in Vidisha,

Her face, the craftsmanship of Sravasti. As the helmsman when,

His rudder broken, far out upon the sea adrift,

Sees the grass-green land of a cinnamon isle, just so

Through the darkness I saw her. Said she, “Where have you been so long?”

And raised her bird’s-nest-like eyes—Banalata Sen from Natore.

At day’s end, like hush of dew

Comes evening. A hawk wipes the scent of sunlight from its wings.

When earth’s colors fade and some pale design is sketched,

Then glimmering fireflies paint in the story.

All birds come home, all rivers, all of life’s tasks finished.

Only darkness remains, as I sit there face to face with Banalata Sen.

বনলতা সেন কাব্য গ্রন্থটিকে যথেষ্ট ব্যাঙ্গবিদ্রূপের সইতে হয়েছে। বিশেষ করে সজনীকান্ত সেন শনিবারের চিঠিতে বলেন- কবিতা লিখিতে লিখিতে অকস্মাৎ অকারণে একজন ভদ্রলোক মেয়ের নাম করিয়া আমাদিগকে উৎসুক ও উৎসাহিত করিয়া তোলেন। কবি তুষার কবির মনে করেন সজনীকান্ত কাব্য সমালোচনার এক পর্যায়ে জীবনানন্দ দাশকে ব্যক্তি আক্রমণ করেছেন।

বক্তব্যে তিনি কয়েকটি কাব্য প্রবণতা উল্লেখ করেন। যেমন- ভ্রামনিক ও ভৌগোলিক কাব্য প্রতিবেশ, ইতিহাস চেতনা, ইন্দ্রিয় আচ্ছন্নতা, গ্রামীণ অনুষঙ্গের ব্যবহার, নিসর্গ মোহগ্রস্ততা, গাঢ় বেদনাবোধ, যৌন অনুষঙ্গের ব্যবহার ও ফেটিসিজম, ইশারা লিখন, সুরয়ালিজম, চিত্রকল্পময়তা, নিজস্ব শব্দ অভিধা ও শিল্পনিপুণতা। সময় স্বল্পতার জন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর সংক্ষেপিত ব্যাখ্যা দেন। কাব্য প্রবণতার সারৎসার আলোচনা করে তিনি বলেন- বনলতা সেন বর্তমান ও অতীতের সমস্ত প্রিয়তমাদের মুখ। কবি প্রেম ও প্রকৃতির সান্নিধ্য অনুভব করেছেন বনলতার সান্নিধ্যে। বনলতা সেনের মুখোমুখি বসে তিনি আধ্যাত্মিক জগতে চলে গেছেন।

সাকিরা পারভীন

এরপর আলোচনা করেন কবি সাকিরা পারভীন। তিনি মনে করেন ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নারী’ এই আলোচনার বিস্তৃতি একটি গবেষণা অভিসন্দর্ভের সামিল। কবির মবনোজগত, জীবন, জীবনাচরণ, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সঙ্গতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক চেতনা, বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পারিপার্শ্বিকতা, সমসাময়িক সাহিত্য এই সবকিছুতেই জীবনানন্দ দাশ জারিত হয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁকে চিত্র রূপময়তার কবি বলেছেন, দীপ্তি ত্রিপাঠী বলেছেন ইম্প্রেশানিষ্ট কবি। কবি জীবনানন্দ দাশ নিজের কবিতাকে দুর্বোধ্যই মনে করেন। নিজের কবিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন- “মহাবিশ্বলোকের ইশারা থেকে উৎসারিত সময়চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো; কবিতা লিখবার পথে কিছুদূর অগ্রসর হয়েই এ আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি। এর থেকে বিচ্যুতির কোনো মানে নেই আমার কাছে।”

কবি সাকিরা পারভীন জীবনানন্দ দাশের তিনটি কবিতার অংশবিশেষ বিশ্লেষণ করেন। কবিতা তিনটি হলো স্থবির যৌবন, বোধ এবং সূর্য নক্ষত্র নারী। প্রথমে ‘স্থবির যৌবন’ থেকে পাঠ এবং বিশ্লেষণ করেন তিনি।

তারপর একদিন উজ্জ্বল মৃত্যুর দূত এসে

কহিবে: তোমারে চাই-তোমারেই, নারী;

এই সব সোনা রুপা মসলিন যুবাদের ছাড়ি

চলে যেতে হবে দূর আবিষ্কারে ভেসে।

বলিলাম; শুনিল সে: তুমি তবু মৃত্যুর দূত নও-তুমি-’

নগর-বন্দরে ঢের খুঁজিয়াছি আমি;

তারপর তোমার এ জানালায় থামি

ধোঁয়া সব; তুমি যেন মরীচিকা-আমি মরুভূমি-’

শীতের বাতাস নাকে চলে গেল জানালার দিকে,

পড়িল আধেক শাল বুক থেকে খসে;

সুন্দর জন্তুর মতো তার দেহকোষে

রক্ত শুধু? দেহ শুধু? শুধু হরিণীকে

বাঘের বিক্ষোভ নিয়ে নদীর কিনারে-নিম্নে-রাতে?

তবে তুমি ফিরে যাও ধোঁয়ায় আবার:

উজ্জ্বল মৃত্যুর দূত বিবর্ণ এবার-

বরং নারীকে ছেড়ে কঙ্কালের হাতে

তোমারে তুলিয়া লবে কুয়াশা-ঘোড়ায়।

তুমি এই পৃথিবী অনাদি স্থবির-

সোনালি মাছের মতো তবু করে ভিড়

নীল শৈবালের নিচে জলের মায়ায়

প্রেম-স্বপ্ন-পৃথিবীর স্বপ্ন, প্রেম তোমার হৃদয়ে।

হে স্ববির, কী চাও বলো তো-

শাদা ডানা কোনো এক সরসের মতো?

হয়তো সে মাংস নয়-এই নারী; তবু মৃত্যু পড়ে নাই আজও তার মোহে।

তাহার ধূসর ঘোড়া চরিতেছে নদীর কিনারে

কোনো এক বিকেলে জাফরান দেশে।

কোকিল কুকুর জোছনা ধুলো হয়ে গেছে কত ভেসে।

মরণের হাত ধ’রে স্বপ্ন ছাড়া কে বাঁচিতে পারে?

কবি সাকিরা পারভীনের মতে স্থবির যৌবন কবিতায় উজ্জ্বল মৃত্যুদূতের আগমণ ঘটেছে। তার সাথে এক নারীর কথোপকথন। কঠিন সময় পার করে মৃত্যুদূত মামুষের রূপ ধারণ করছে আর কবিতায় সংশয়বাদীতার সুর জাগছে। জানালায় যে থামছে এই তুমি কি নারী, কোনো অশরীরী, নাকি কবির প্রতিবিম্ব? নিতান্তই রাতে শারীরিক ক্ষুধা তৃষ্ণা নিয়ে উপস্থিত হয় কেউ নিজের প্রয়োজনে। মানুষের প্রতিবিম্বের কাছে ‘ফ্রয়েড’ এর উপস্থিতি পরিলক্ষিত। কবি ছটফট করে ওঠেন। তাৎক্ষণিক ছুরি চালান নিজের উৎপাদিত ফসলে। এবার মৃত্যুদূতকে ফিরিয়ে দেয় ফ্রয়েডীয় মানুষ। রক্তমাংসের মানুষ ফিরিয়ে দেয় মৃত্যুকে অথবা নিজেকেই। চরিত্রের দোদুল্যমানতা বা অস্বস্তিময় বিবর্ণতার কাছে সে কুঁকড়ে যেতে থাকে।

এরপর মৃত্যুদূত কবিতার নারীকে কঙ্কালের হাতে সমর্পনের কথা বলেন। কবি নিজেই যেন প্রতিবিম্বের কাছে ধরা পড়েন। এই প্রতিবিম্ব অনাদি, স্থির, শ্বাশত, সমকালীন নয় প্রকৃতপক্ষে মহাকালীন।

স্থবিরতাকে তিনি তাঁর চাওয়া বা আকাঙ্ক্ষার কথা জিজ্ঞেস করছেন। একটি কবিতায় ব্যক্তিক ও নৈর্ব্যক্তিক সত্তা এসে উপস্থিত।  নারী, যার অবয়ব শুভ্র শাদা, সেই নারীও কি মৃত্যুদূত নয়? নারীর মোহনীয়তা মৃত্যুকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। কবিতায় বর্ণিত এই নারীর কবির আত্মপ্রতিকৃতি। এই সময়, এই মৃত্যুকে আকৃষ্ট করতে তিনি এখনও অপারগ। স্থবির যৌবন কবিতায় জীবনানন্দ দাশ নারীকে একই সাথে সময়, মহাকাল, আত্মপ্রতিকৃতি, প্রতিপক্ষ, মৃত্যুদূত অন্তত এই পাঁচটিভাবে উপস্থাপন করেছেন।

‘বোধ’ কবিতা থেকে একটি স্তবক উল্লেখ করেন সাকিরা পারভীন। নারীর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে পড়লে স্পষ্টতই বোঝা যায় নারীর ভাবনার স্থুলতা কবি মানতে চাননি। নারীর গভীর একাকীত্ব, বেদনাবোধ

তিনি অনুভব করেছেন এভাবে-

“জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে

সন্তানের মতো হ’য়ে—

সন্তানের জন্ম দিতে-দিতে

যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়,

কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়

যাহাদের; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজখেতে আসিতেছে চ’লে

জন্ম দেবে—জন্ম দেবে ব’লে;

তাদের হৃদয় আর মাথার মতন

আমার হৃদয় না কি? তাহদের মন

আমার মনের মতো না কি?

—তবু কেন এমন একাকী?

তবু আমি এমন একাকী।”

এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেন, নারীকে জীবনানন্দ দাশ একান্তই প্রেমিকার মতো দেখেছেন ‘সূর্য নক্ষত্র নারী’ কবিতায়। নারীর অপার আলোকবর্ষে একটি মুহূর্তকে অনন্ত করার ইচ্ছে জাগে পুরুষ মানুষের।

অধঃপতিত এই অসময়ে কে-বা সেই উপচার পুরুষমানুষ?–

ভাবি আমি–জানি আমি, তবু

সে কথা আমাকে জানাবার

হৃদয় আমার নেই–

যে-কোনো প্রেমিক আজ এখন আমার

দেহের প্রতিভূ হয়ে নিজের নারীকে নিয়ে পৃথিবীর পথে

একটি মুহূর্তে যদি আমার অনন্ত হয় মহিলার জ্যোতিষ্কজগতে।

ফরিদ কবির

তুষার কবীর এবং সাকিরা পারভীনের আলোচনার রেশ ধরে কবি ফরিদ তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। তিনি মনে করেন জীবনানন্দ দাশের জীবনে যে নারীরা এসেছেন এবং যেসব নারী আসেননি কিন্তু আসবার কথাছিল, তাদের সকলকের কথাই তাঁর কবিতায় আছে। বিশেষ করে তিনজন নারীর কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশ, স্ত্রী লাবণ্য দাশ, আরেকজন শোভনা।

তাঁর কবিতায় মায়ের উপস্থিতি কম, লাবণ্য দাশের উপস্থিতি অনেকখানি আছে। সবচেয়ে বেশি আছে শোভনার উপস্থিতি। কবিতায় বেশির ভাগ নারী চরিত্রের নানের অদ্যাক্ষর স/শ। সুদর্শনা, শ্যামলী, সুরঞ্জনা, সরোজিনী, সুচেতনা, শ্যামলী… সবাইকে যেন তিনি কল্পনা করেছেন শোভনাকে ঘিরেই। যে ঠোঁট তিনি দেখছেন সুরঞ্জনার সেটা শোভনার, বনলতার চোখ আসলে শোভনারই। সকল নারীর মধ্যে তিনি শোভনাকেই দেখেছেন।

তাঁর কবিতায় শুধু নারী শব্দটিও এসেছে। সেখানে কোনো নাম ব্যবহৃত হয়নি। মহিলা শব্দটি এসেছে। কিন্তু নামহীন সেই নারীকেও একজন পাঠক হিসেবে ফরিদ কবির শোভনাকেই দেখতে পান। ‘ঝরা পালক’ এর প্রথম সংস্করণে উৎসর্গ পত্রে জীবনানন্দ দাশ শুধু ‘কল্যাণীয়াষু’ লিখলেও পরের সংস্করণে ‘বি এ ওয়াই’ লিখেছিলেন। সম্ভবত এটা শোভনাই। কারণ শোভনাকে ডাকতেন বেবি নামে।

তিনি আকবর আলী খানের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বনলতা সেন’কে গণিকা হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ধারণা করা হয়েছে অন্তত দুবার বনলতার সাথে তাঁর দেখা হয়েছে। “এতদিন কোথায় ছিলেন?” এই প্রশ্নটিতে বোঝা যায় জীবনানন্দ আগেও একবার বনলতার কাছে গিয়েছিলেন।

জীবনানন্দের কবিতায় কিছু নারী চরিত্র উল্লেখ করেন ফরিদ কবির। যেমন- শ্যামলী তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতো…  সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি মনে হয় কোন এক বসন্তের রাতে ভূমধ্যসাগর ঘিরে সেই সব জাতি, তাহাদের সাথে সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন… সুরঞ্জনাকে বলছেন ফিরে এসো সুরঞ্জনা… উল্লেখিত প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রে ভাবনা আলাদা কিন্তু কোথায় যেন একই সুত্রে গাঁথা। আরও বলা যায় সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে— এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে; সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ… কিংবা মানবকে নয়, নারী, শুধু তোমাকে ভালোবেসে বুঝেছি নিখিল বিষ কী রকম মধুর হতে পারে… এই কবিতাগুলোয় নারীকে দেখা যায় অধরা হিসেবে। ব্যক্তিগত জীবনে শোভনাকে পাবার উপায় ছিল না। এই দূরত্ব, না পাওয়ার বেদনা, তীব্র হতাশা, উৎকন্ঠা সব সময় জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ছিল। লাবণ্য দাশের কথা সবচেয়ে বেশি এসেছে তাঁর গল্প উপন্যাসে। বিশেষ করে যেখানে চাকরীহীনতা, অর্থকষ্ট বা টাকা ধার করার ব্যাপারগুলো এসেছে।   জীবনানন্দের ছবি দেখলে বোঝা যায় চোখ দুটো যেন বেদনাভারাক্রান্ত। তাঁর চোখের চেয়ে তাঁর সাহিত্য বেশি বেদনাসজল। এই না পাওয়ার বেদনাই তাঁকে নির্জন করেছে। নির্জনতায় যাওয়া ছাড়া তাঁর আর উপায় ছিল না। তার ব্যক্তিগত জীবন তাঁকে নির্জনতম করেছে।

কবি ফরিদ কবির উল্লেখ করেন, সমাজ ও রাজনৈতিক ভাবনা, ইতিহাস চেতনা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তাঁর অনেক কবিতা আছে। কিন্তু জীবনানন্দের কবিতায় নারী নিয়ে বলতে গেলে ‘শঙ্খমালা’ কবিতার পঙক্তি ধরে তিনি এগোতে চান- “বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি” এ কথা তিনি বলছেন একজন নারীকে কিন্তু এ যেন তারই প্রতিবিম্ব। যে চোখ তিনি দেখছেন, সেটা আসলে তাঁর নিজেরই ব্যথিত চোখ। “…কুয়াশার পাখনায়- সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক জোনাকির দেহ হতে- খুঁজেছি তোমারে সেইখানে- ধূসর পেচার মতো ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে” নিজের জীবনের অন্ধকারেই তিনি ফিরে আসছেন। “ধানসিড়ি বেয়ে-বেয়ে সোনার সিঁড়ির মতো ধানে আর ধানে তোমারে খুঁজেছি আমি নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে।” খুঁজে চলছে কবি, যাকে পাওয়া যাচ্ছে না। “চোখে তার যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার!” আবারো অন্ধকারের কথা বলছেন কবি। স্তন তার করুণ শঙ্খের মতো– দুধে আর্দ্র-কবেকার শঙ্খিনীমালার! এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।” এই যে একবারই পায়, আর কখনও পায় না এটাই জীবনানন্দ দাশের জীবনে আর কবিতায় নারীর ভূমিকা। এই এক লাইনেই দেখতে পাই ‘পায় নাকো আর’। এই বেদনাবোধ আমাদের মাঝে ছড়িয়ে যায়। এই হতাশা পাঠকের মনে সঞ্চারিত হয়।

আলোচনা অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন গাঁথার সিনিয়র সদস্য কবি জুনান নাশিত। আলোচনা অনুষ্ঠানে জীবনানন্দ দাশের কবিতা আবৃত্তি করবেন সুলতানা ফেরদৌসী এবং লায়লা মুন্নী। উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক সৌদা আক্তার বহুমাত্রিক লেখক মুম রহমান।  বিশেষ করে বনলতা সেনকে ‘গণিকা’ বলে আখ্যায়িত করা যায় কি না এ নিয়ে নিজস্ব অনুভব প্রকাশ করেন গাঁথার সদস্যরা। প্রাণবন্ত এই আলোচনায় জীবনানন্দের কবিতার নারীরা যেন মূর্ত হয়ে উঠেছিল। গাঁথার সদস্য এবং উপস্থিত অতিথিদের জন্য সেটা ছিল পরম পাওয়া।


1,052 Comments