জুনান নাশিতের পাঁচটি কবিতা



মাধবী মুকুট

ডুবন্ত সূর্যের কাঁধে অচেনা নদীর স্রোত!!

আমার দু’চোখে দিগন্ত উৎসব

দৃষ্টির তালুতে রক্তবর্ণ ঘোর

আমি দাঁড়ালাম তোমার নিঃসঙ্গ তর্জনীর কাছে

স্বাদ গন্ধহীন সময়ের মতো নিঃশব্দে

তুমি ক্লান্ত জলাশয়ে মেলে দিলে বিভীষিকা রাত

ভেজা ভেজা দীর্ঘশ্বাসে জুড়ে দিলে অতিবৃষ্টির ধার।

আমি ঠায় দাঁড়িয়ে তোমার তর্জনীর কাছে

কাছাকাছি, তবু দুজনের মাঝে গ্রহান্তরের ঢেউ;

গভীর ঘন রাতে

তুমি তর্জনী ঢেকে দিলে মাধবী মুকুটে।

 

কাঁদে বাশুলির বাংলাদেশ

অভয়নগরে পূর্ণ তিথি রাত

তারাগুলো মৃদুলয় মান্দার ধ্বনির পাশে

জোছনার অণুছিদ্রে কুয়াশা প্রাচীর

বেদনার ভাটিতে বাঁশির ডাক

চারিদিক চুপচাপ, ঘোরহীন উন্মুক্ত উদাস।

 

মধ্যরাতের অচেনা হিমে

মেয়েটি আবেশ ভরে স্বামীর আদরে

নয়কুড়ি মার্বেলের রূপকল্প আঁকে

পেঁচার দূষিত শীষ নিরুচ্চার শীৎকারের বেশে

ঘরের দাওয়া থেকে ঘুমের উদরে

শৈশবের মতো নিঃশব্দে গড়ায়।

 

রাতের শেষ প্রহর

অভয়নগরে গ্রহণের কাল

পূর্ণ তিথি চাঁদে জমে অহল্যার বিষ

খেজুর রসের টুপটাপ ঝড়ে

ভেসে ওঠে পৃথিবীর যাবতীয় দুঃস্বপ্নের করাঘাত

ঘরের বিছানা ছেড়ে মেয়েটির নাভিনিম্ন ভূমি

যেন একাত্তুরের একটুকরো বাংলাদেশ

ফসলী মাঠের পাড়ে পড়ে থাকে

বাড়ে চক্রনেমি…

 

সরষে ফুলের মিহিসুরে ভোর হয়

নরম আলোয় জেগে ওঠে জনপদ

কোলাহল বাড়ে

মেয়েটির কাঁচুলির হুক থেকে উবে যায় সংক্ষুব্ধ শিশির

খোলা ঝিনুকের মতো রক্তাক্ত যোনির পাশে পিঁপড়ের সারি

লাভার করাত হয়ে পম্পাই নগরী থেকে নেমে আসা

সংখ্যাগুরুর বীর্যের মউ

লেপ্টে থাকে খটখটে মাটির ঢেলায়।

 

সূর্যের উত্তাপে ধীরে ধীরে জনশূন্য সময়ের কণা

মাটির ঢেলায় সুরেলা রঙিন প্রজাপতি ফুল

বাষ্পগন্ধ নিয়ে ভরে দেয় চারিদিক

তবু নির্জনে রোদন বাড়ে

গৃহকোণ ভরে যায় বাদুর বিলাপে

একক অপেক্ষা ছেড়ে সমষ্টির ভীড়ে চোখ তোলে

আঁধারের খোপ, খোঁজে আলোর ইশারা ঢেউ;

 

বাশুলির বাংলাদেশ আঁচল ছড়িয়ে কাঁদে

ভাঙে আওড় বাওড় থেকে জেগে ওঠা

তর্কাতীত বিশ্বাসের ভিত।

 

সুবর্ণগ্রাম

খোলা আকাশের নীচে তুমি এক খন্ড বস্ত্রের আকার!

নিস্তব্ধতার হৃৎ পুকুর হয়ে জড়িয়ে রয়েছো মসলিন মায়ায়

সুবর্ণগ্রাম,

তুমি উন্মোচিত আকাক্সক্ষার ভেতর থেকে নেমে আসা কুয়াশা জমিন।

 

খাসনগর দীঘির পাড়ে ভোরের সূর্য আলো খেলায় মেতেছিল সেদিন

হাতকোপা গ্রাম থেকে রঙিন পায়রার ঝাঁক উড়ে গেল

পানাম নগর পেরিয়ে

মসলিনে মোড়ানো প্রান্তর অকস্মাৎ সূর্যমুখী আলোর ফোয়ারা বেয়ে

নেমে গেল মেঘনার বুকে

সুবর্ণগ্রাম, তুমি দূর জন্মে বেড়ে ওঠা বিনাশের প্রতিধ্বনি

ছড়িয়ে রয়েছো জীবনের ক্ষয়িষ্ণু ভিটায়

৫৫ হাজার বর্গমাইল জুড়ে যে বিস্ময়ের তোপধ্বনি আমার স্বপ্নঘোরে

সুবর্ণগ্রাম তুমি তারই রেশ, আমার প্রাচীন ভূমি।

 

ঈশা খাঁর ঝলসানো তলোয়ারে ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত ধড়

জ্যোৎস্না ফোটা নীরব অন্ধকারে আমাদের পায়ের কাছে

যেন বেদনার বিশুদ্ধ গোলক লুটোপুটি খায়

খাঁজকাটা সুপ্রাচীন এক তাঁতঘরে।

সুবর্ণগ্রাম, তোমার পথে পথে শিশির সন্যাস

তাঁতীদের অবিস্ফারিত দীর্ঘশ্বাস, কাটা আঙুলের ছাপ

সুবর্ণগ্রাম, তুমি না ফোটা আলোর পল্লব

চোখে লেপ্টে থাকা গুনগুনে বিরহগীত

জয়নুলের স্বপ্নপূরণের লোকায়ত ইতিহাস

তুমি ঋষিপাড়ার সেই মন্দির পাঠশালা

যেখানে ছোট্ট কোমল মেয়েটির মুখে আমরা দেখেছিলাম

শ্যামল নিবিড় একটুকরো বাংলাদেশ।

 

লাল বেলুন

উড়িয়ে দিয়েছি সব

ভেসে গেছে হাওয়ায় হাওয়ায়

লালরঙা বেলুনটিতে উচ্ছ্বাসের হেমন্ত সকাল

সেও গেছে ভেসে !

 

উরুতে রক্তের দাগ নিয়ে যে কিশোরী আজো ছোটে শূন্য মাঠে

কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলা শেষে

নীল য়্যুনিফর্ম জুড়ে থাকা তির তির নদীর কিনার

ডোবে খাঁজকাটা লাল বেলুনের ফাঁদে-

 

ওই দূর প্রান্তরের মায়া মরীচিকা ডেকেছে দু’হাত ভরে তাকে

লাল বেলুনের খাঁজে ডুবে থাকা কষ্ট পোড়া বীজ তুলে নিয়ে সে

ছড়িয়েছে অনার্য শব্দের পিঠে

সেই থেকে বুকের অতল স্রোতে কাঁপা কাঁপা শালিক চোখের ঘুম

নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে ওড়ে হলুদ পাতার ঢেউ

সেই থেকে হাঁটু ছিলা শৈশবের মাঠে কেবলই লাল বেলুনের দৌড়,

সেই থেকে মেয়েটির পাশে হাঁটে ভাপে ভেজা নিঃসঙ্গ সংসার !

জীবন জঙ্ঘায় ওড়ে লৌকিক মায়ার কাল

সেই থেকে গভীর অসুখে পোড়ে মেয়েটির মন

একদিন সেও পিছু নেয় দুলে দুলে উড়ে চলা ওই লাল বেলুনের

 

বাবুই পাখির বিলাপ ও অন্যান্য

ফোরজি’র আকাশে ওড়ে বাবুই পাখির বিলাপ

তাদের স্বপ্ন বুনন পুড়ে গেছে অমবস্যার আগুনে

সে আগুন এখন তারাদের রক্তেভেজা চোখের কোটরে;

একদিন রক্ত শুকিয়ে কাঠ-

কাঠ থেকে তৈরি যে ইজিচেয়ার

তার ঠিক মধ্যিখানে কোমল শীতের রোদ

সূর্যের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে

ধীরে ধীরে তার শরীর ঢেকে যাচ্ছে বাজপাখির ডানার ছায়ায়,

 

একদিন সে ছায়া নিংড়ে ভেসে আসে বৈশাখের উল্কারথ

আমাদের নিয়ে যায় নির্লিপ্ত বাসনার কেন্দ্রঝড়ে

সে ঝড়ের দুপুরে চোখের গভীর থেকে উঠে আসে পেঁচানো ক্রোধের ¯্রােত

তাতে ঠাঁই নেয় বাবুই পাখির বিলাপের ঢঙ।

 

আরো একদিন ফোরজি’র আকাশ ভেঙে বর্ষা নামে

তুমুল তীব্রতায় ঝড়ে পড়ে সঙ্গমাসক্ত দুই নর-নারীর পিঠের ভাঁজে

যেখানে আগে থেকেই নিদ্রিত ছিল আমার কিংবা আমাদের

ছোট্ট বেলায় হারিয়ে ফেলা তুলতুলে এক বিড়ালের লোম।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


2,752 Comments