তাম্রচূড়ের লড়াই :: আনোয়ারা সৈয়দ হক



          আনোয়ারা সৈয়দ হক

রোজ বসে তারা। রোজ রোজ। একদিনও বাদ যায় না। স্বাচ্ছন্দ্যের দোরগোড়ায় যতদিন ধরে তারা একে অপরকে চিনেছে, ততদিন ধরে তাদের এই বসা, অবশ্য যদি না একজন থাকে কখনো বিদেশে।
আজ চিন্তা করা গিয়েছিল যে লাল পানীয় খাবে, অর্থাৎ ওয়াইন। কিন্তু পাল্টে হল হুইস্কি। এ হোটেলে ভালো ওয়াইন নেই। আগে খবরটা জানত না, জানলে হয়ত আসত না, কিংবা আসত, কিচ্ছু বলা যায় না। আজকাল এমন হয়েছে যে কোনো কিছু ঠিক করে বলা যায় না। বলা যেন সম্ভবও নয়। তাছাড়া মন মেজাজেরও ঠিক থাকে না কিছু। যদি দু’জনে ভাবে আজ যাবে উত্তর দিকে তো চলে যায় দক্ষিণে। দু’জনের গাড়ির ড্রাইভারও সাহেবদের এরকম ঘূর্ণায়মান মেজাজের সাথে বহুদিন পরিচিত। তবে রোজ দু’জন ড্রাইভার থাকে না। একজন থাকে। একজন আরেকজনকে বাসা থেকে তুলে নেয় বা কেউ গাড়ি করে এসে আবার গাড়ি ফেরত পাঠায় বাড়িতে, কারণ একটা গাড়ি হলেই চলে। সারাপথ কথা বলতে বলতে যাওয়া যায়।
গল্প? না, তারা গল্প করে না, বা করলেও খুব বেশি গল্প নয়, মূলত কাজের কথাই তারা বলে। ফ্যাক্টরির চালানের কথা বলে, কর্মচারিদের অলসতার কথা বলে, অসাধুতার কথা বলে, ধর্মঘটের কথা বলে, কোনোদিন কারখানায় যদি কোনো রকমের অঘটন ঘটে, যেমন এক সেকশনের সাথে আরেক সেকশনের অসহযোগিতা, একজনের হঠাৎ চাকুরি ত্যাগ আরেকজনের কারখানায় বেশি পয়সার লোভে, বা গার্মেন্ট কর্মচারিদের ভেতরে প্রেম এবং অনৈতিকতা, বস্তুত এতসব বলার কথা থাকে প্রতিদিন যে তাদের আর উটকো গল্প করার সময় হয় না। তবে রোজই প্রায় বিদায় নেবার সময় একটা তর্ক বাঁধে তাদের। সেটা অবশ্য ভিন্ন বিষয়। জীবনের সব কিছুই আসলে একটার থেকে আরেকটা ভিন্ন। যদি একজন মানুষের মনের ভেতরে আরেকজন মানুষ বসে থাকতে পারে, বা তারও ভেতরে আরেকজন তাহলে জীবনের বিষয়গুলোই বা ভিন্ন হবে না কেন?
এমনিতে ফ্যাক্টরির দৈনন্দিন গল্প করতে করতেই তাদের সময় কেটে যায়। হুইস্কি পানীয়টি নিজে নিজেই তার ভোক্তাকে অনেক লম্বা পথ টেনে নিয়ে যেতে পারে, পানীয়ের মৌজ যখন মাথার ভেতরে কুন্ডলী পাকায়, তখন সব কিছু বড় সহজ সরল হয়ে আসে। ভালো লাগে, এত ভালো লাগে যে শুধু হাসতে ইচ্ছে করে। হাসেও। এই জীবন তাহলে কীসের জন্যে? হাসির জন্যেই তো। হাসতে হাসতে দুজন উত্তর চল্লিশের লোক একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, গালে গাল ঘষে, তারপর হঠাৎ যেন সচকিত হয়ে অপ্রভিত হয়ে পড়ে কিছুক্ষনের জন্যে। দু’জনে কি বাল্যকালের বন্ধু? মোটেও নয়। একটা ক্লাবে মদ খেতে গিয়ে দেখা এবং সেই থেকে আলাপ। এখনও দু’জনে দু’জনকে আপনি বলে সম্বোধন করে।
আজও একটা হোটেলে দু’জন এসে বসল। এই হোটেলটা একবারে শহরের উত্তর প্রান্তে। এখানে রাস্তায় খুব ভীড়। কিন্তু মন যখন হয়েছে তখন তো যেতেই হবে। তাছাড়া প্রতিদিন আশুলিয়ায় কারখানা যাবার সময় এ পথেই তো যেতে হয়, তবে আর কথা কি।
হোটেলের লবিতে বসতেই আশরাফুদ্দৌলা খুক খুক করে কাশতে লাগল। আজ আশরাফুদ্দৌলার গাড়িতেই মনিরুজ্জামান এসেছে। কাশি দেখে মনিরুজ্জামান বলে উঠল, আজ ডিনার শেষে একটু ব্রান্ডি খেয়ে নেবেন। কাশি ভালো হয়ে যাবে।
তা তো যাবে, কিন্তু একটা ব্যাপার আমি আজকাল লক্ষ্য করছি মনির, আর সেটা হল রোজ সকালে বেশ কিছুক্ষণের জন্যে আমার হাত দুটো কাঁপে। বেশ কিছুক্ষণ। তারপর আবার আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।
ও কিছু না জানবেন, সকাল বেলা আপনার শরীর একটু হুইস্কি চায়। জাস্ট এক সিপ, বুঝলেন? দেখবেন কাঁপুনি কোথায় পালিয়েছে। আমারও ওরকম মাঝে মাঝে হয়।
এটা অ্যালকোহল উইথড্রল সিম্পটম নয়তো ভাই? সেদিন টেলিভিশনে দেখলাম-
আরে না, না, ওসব হতে যাবে কেন? তাছাড়া আমরা কি রোজ বোতল শেষ করি? জাস্ট এই দুই পেগ।
যা বলেছেন মুনির। তারপর আপনার কারখানার সেই ঝামেলা মিটে গেছে? আস্বস্ত হয়ে বলে উঠল আশরাফুদ্দৌলা।
ঝামেলা কি আর মেটে ভাই, আজও দু’জনকে দেখা গেছে বাথরুমের দরজা ধরে গল্প করতে। এখন মুশকিল হচ্ছে যে দু’জনের কাউকে আমি ছাঁটাই করতে পারছি নে। কারণ দু’জনেই তারা বিবাহিত। ছেলেপুলে আছে। আর দু’ জনেই আমার কারখানার বেস্ট কর্মচারি। এখন ওরা যদি হোমো হয়, আমার কি করার আছে?
মনিরুজ্জামানের কথা শুনে একটু যেন ভাবিত হয়ে বলে উঠল আশরাফুদ্দৌলা।
হোমো আজকাল আমাদের দেশে একটু একটু করে প্রকাশ পাচ্ছে, বুঝলেন মনির? এ একটা নতুন ব্যাধি আমাদের দেশে। হোমোসেক্সুয়ালিটি। ওরে ব্বাস, বিদেশে এই নিয়ে কত তুলকালাম হয়েছে আগে, এখন তো সব ঠান্ডা। এখন নাকি বলে, এরকম ভাবনা মানুষের ভেতরে আসতে পারে। মানুষের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন নাকি রিভার্স হতে পারে। মেয়ে মেয়ের জন্যে বুঝলেন, আর ছেলে ছেলের জন্যে, আবার নাকি বাই-সেক্সুয়ালও হয়, অর্থাৎ দুই রকমের সেক্সই তারা এনজয় করে। স্যাফোর নাম শুনেছেন, সেই স্যাফো? সেই খ্রিষ্টপূর্ব সাত শতাব্দীতে যার জন্ম? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে মহিলার নাম শুনেছিলাম। মহিলা ছিলো দারুণ এক কবি কিন্তু ছিলো বাই-সেক্সুয়াল। সেখান থেকেই তো লেসবিয়ান শব্দটা এসেছে, কারণ সে বাস করত গ্রীসের লেসবোস-এ আর মেয়েদের সাথে গভীর সব প্রেম করতো। তাদের নিয়ে ভালো ভালো কবিতা লিখতো। কিন্তু কী সাংঘাতিক বলেন দেখি? সেদিন একটা ম্যাগাজিনে দেখলাম একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষের মুখে চুমো খাচ্ছে ! কী আগলি ব্যাপার ভাবুন তো?
ঠিক। মাথা নেড়ে বলল মনিরুজ্জামান। তারপর বলল, তাহলে চলেন আমরা ভেতরে গিয়ে বসি।
বেয়ারা হুইস্কি নিয়ে আসে, তার সাথে সোডা মেশানো হয়। মনিরুজ্জামান হাত বাড়িয়ে হুইস্কি নেয় এবং পরম পরিতোষের সাথে সিপ করে। তারপর মুখ গম্ভীর করে কী যেন ভাবে, হয়তো তার পুরুষ কর্মচারি দুজনের কথা। যত ভালো কর্মচারি হোক, এরকম স্ক্যান্ডাল হলে তাদের কাজে রাখা মুশকিল হয়ে যাবে, চাই কি কারখানার বদনামও হতে পারে। অবশ্য কারখানা মানে সবসময় ধোয়া তুলসি পাতা নয়, রোজ সেখানে কিছু না কিছু ঘটছে, তার জানা অবস্থাতেই দু’জন মেয়ে যারা বছর খানেক আগে শহরতলী থেকে এসেছিল কারখানায় কাজ করতে, তারা চাকরি ত্যাগ করে বারবনিতা হয়েছে, নাকি সেখানে বেশি রোজগার করা যায়। তবু সেটা সহ্য করা যায়, কিন্তু পুরুষে পুরুষে, নাঃ, ব্যাপারটা জঘন্য।
মনিরুজ্জামানের মনের ভাব না বুঝে আশরাফুউদ্দৌলা বলে, বাড়িতে আমি স্রেফ বলে দিয়েছি আমার ওপর বেশি খোদকারি না করতে। সারাদিন আমি কারখানায়, কারখানার মানুষের জন্যে, কিন্তু সন্ধে বেলাটা হল আমার, আমার নিজের জন্যে? আপনি কী বলেন?
আমার তো ওসবের কোনো বালাই নেই। আজ কতদিন স্ত্রীর সাথে আমার ঠিকমত কথা নেই। রাতের বেলা সে আমার দিকে পাছা ফিরোন দিয়ে শোয় আর আমিও তার দিকে পাছা ফিরোন দিয়ে শুই!
তাই নাকি? কথাটা বলে খুক খুক করে কেশে উঠল আশরাফুদ্দৌলা। কিন্তু এটাকে হাসি বলে অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যায়।
মনিরুজ্জামান বলল, আর কাঁহাতক বলেন তো? জীবনে যা যা চেয়েছিল, যেমন গাড়ি বাড়ি আসবাব বেড়ানো বিদেশ ভ্রমণ, সবই দিয়ে সেরেছি। এখন সে বছরে দু’বার করে আমেরিকা যায় ছেলেকে দেখে আসার জন্যে, আমিও মানা করিনে, হাজার হোক মা তো।
কিছু মনে করবেন না, তাহলে আপনার সেক্স লাইফ? হঠাৎ সাহসী হয়ে বলে উঠল আশরাফুদ্দৌলা। কথাটা বলেই নিজেকে সামলে নিল সে। একটু বেশী কৌতুহল প্রকাশ করা হলো নাকি?
কিন্তু দেখল বিষয়টা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই নিল মনিরুজ্জামান। বলল, আর সেক্স লাইফ, ইচ্ছে তো হয়, কিন্তু উপায় কি? মাস্টারবেশন করি মাঝে মাঝে, আর যখন সিঙ্গাপোরে যাই-
ব্যস, ব্যস! হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল তাকে আশরাফুদ্দৌলা। আপন মনে কিছুক্ষণ পান করে বলল, যত যা বলেন, ব্ল্যাক লেবেলটাই আমার বেশি পছন্দ। সব কিছু টেস্ট করে দেখলাম তো। সেই যে স্টুডেন্ট লাইফে একজন বড় ভাইয়ের হাত ধরে হোটেলে বসে খেলাম তো মুখে লেগে গেল সারা জীবন। মাঝে মাঝে মনে হয় কি জানেন, গরিবের ছেলে ছিলাম, হয়তো হুইস্কি কিনে খাবার পয়সা জীবনে জুটবে না, আর সে কারণেই হয়তো এত তোড়জোড় করে খেটেপিটে ইন্ডাস্ট্রি করার চেষ্টা! আমি আবার বুঝলেন মদ খাবার জন্যে মানুষের কাছে হাত পাতাটা অপছন্দ করি। এইটুকু আত্মমর্যাদা বোধ আমার আছে।
আপনি যাকে আত্মমর্যাদাবোধ বলছেন, আমি সেটাতে দ্বিমত পোষণ করি। হুইস্কি পান করতে করতে বলল মনিরুজ্জামান।
তাহলে সেটা কি?
সেটা হল আপনার এক ধরণের বোকামি, কারণ অধিকাংশ মদখোরই অপরের পয়সায় মদ খেয়ে থাকে। আরও একটা কথা। এইটুকু বলে ছোট্ট একটা হেঁচকি তুলল মনিরুজ্জামান। তারপর থম মেরে বসে থাকল।
কী? কথাটা শেষ করেন। বলল আশরাফুদ্দৌলা।
শেষ করার কিছু নেই। যতটুকু বলেছি ততটুকুই ঠিক।
তার কথা শুনে একটু অসহিষ্ণু হয়ে আশরাফুদ্দৌলা বলল, কিন্তু আপনি বললেন, আর একটা কথা, তার মানে আরও একটা কথা আছে।
এইসময় বেয়ারা প্লেটে করে নিয়ে এল গরম পরোটা। আর তার সাথে শিক কাবাব। পরোটাগুলো ফুলে একেবারে যেন আকাশচুম্বি। এই হোটেলের ফোলা পরোটা একটা বৈশিষ্ট্য দাবী করে।
এ কি! এত ফোলা পরোটা কোত্থেকে এল? অবাক হয়ে মনিরুজ্জামান জিজ্ঞেস করল।
কিচেন থেকে স্যার। বলল বেয়ারা। তারপর টেবিলে সাজিয়ে রাখল।
বেয়ারার কথা শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থকল মনিরুজ্জামান। তারপর মাথা নেড়ে বলল, উঁহু, এতো নরমাল নয়! পরোটা তো এত ফোলার কথা নয়! এত ফোলা পরোটা তো কেমিক্যাল না মেশালে হবার কথা নয়! আমি কোনো প্রকারের ভেজাল খাবারে বিশ্বাস করিনে। যা খাবো সব পিওর। ফিরিয়ে নিয়ে যাও। নরমাল পরোটা ভেজে নিয়ে এসো। জোর গলায় বলে উঠল মনিরুজ্জামান।
তাদের টেবিলের আশেপাশে এখন অনেক মানুষ বসে আছে। হোটেলটা ফাইভ স্টার। কিছু না হোক কিছু এটিকেট বাধ্য হয়ে বজায় রাখতে হয়। আর মনিরুজ্জামানের গলার স্বর ছেলেবেলা থেকে যে হেঁড়ে ছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই আশরাফুদ্দৌলার। সে তড়িঘড়ি করে বাধা দিয়ে বলল, আরে আপনি বলেন কি, ফোলা পরোটা কি কোনো আশ্চর্যের বিষয় হলো?
হবে না মানে? মনিরুজ্জামান বাধা দিয়ে বলল, তারপর বেয়ারার দিকে ফিরে বলল, পরোটা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে নরমাল ভাবে ভেজে নিয়ে আসো, যেভাবে বাড়িতে লোকে ভাজে সেভাবে, ঠিক আছে? মনে করো এটা একটা বাড়ি, ঠিক আছে?
বিমূঢ় বেয়ারা কিছু না বুঝে মাথা নেড়ে সায় দিল।
আশরাফুদ্দৌলা বলল, ফিরিয়ে দিয়ে লাভ নেই ভাই, পরোটা ঠিক মতোই ফুলেছে, মানে যতটুকু ফুলতে পারে, ততটুকু। কাবাব দিয়ে গরম পরোটা ফার্স্টক্লাস হবে।
কীভাবে? মনিরুজ্জামান সামান্য উত্তেজিত হয়ে বলল, কীভাবে পরোটা এতখানি ফুলবে যদি না কেমিক্যাল মেশানো হয়? এই পরোটা খেয়ে কি আপনি অকালে প্রাণ হারাবেন?
এবার আশরাফুদ্দৌলাও যেন সামান্য উত্তেজিত হয়ে চাপা গলায় বলল, কেন ফুলবে না?
কীভাবে ফুলবে আপনি এক্সপ্লেন করেন। ময়দা আপন মনে ফুলবে? নাকি কেমিক্যাল মেশালে তবে ফুলবে? দেখছেন না টন কে টন পাকা আম নষ্ট করে ফেলা হল এই সেদিন? কেন করা হল? তাদের চেহারা খারাপ ছিল বলে? নাকি কেমিক্যাল মেশানো হয়েছিল বলে?
কথাটা বিলকুল ঠিক। আজকাল প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজ খুললে দেখা যায় যে বাজারে ওঠা ফলমূল একভাবে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে তার ভেতরে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মেশানোর জন্যে। এইসব কেমিক্যাল নাকি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র নষ্ট করে দেয়। অথচ বাইরে থেকে দেখলে ফলগুলোর চেহারা কী সুন্দর! আমের রঙ দেখলে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পেপের রঙ দেখলে তখুনি কেটে খেতে ইচ্ছে করে। কলা, কলার শোভাও বাইরে থেকে দেখতে মন্দ কি। অথচ আজকাল প্রায় সবই ভেজাল মেশানো। শুধু কি ফলমূল? মাছ, টনকে টন ফর্মালিন দেয়া মাছও নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে ইদানিং। এটা যেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের এক ধরণের ষড়যন্ত্র।
কিন্তু পরোটা? তাও এরকম একটা হোটেলে, যেখানে অর্ধেক মানুষই ফরেনার? অসম্ভব কথা!
আশরাফুদ্দৌলার মুখের ভাব দেখে যেন সান্ত্বনা দেবার জন্যে মনিরুজ্জামান বলল, আমার বাড়িতে প্রায় প্রত্যেকদিন পরোটা নাস্তা হয়, সবসময় পরোটা চ্যাপ্টা হয়ে থাকে, মচমচে কিন্তু চ্যাপ্টা। এটাই আদতে পরোটার আসল চেহারা। কোনো কেমিক্যাল মেশানো হয় না তাতে। আর আপনি যেটা বলছেন ফোলা পরোটা, সেটা আসলে লুচি। হিন্দু বাড়িতে লুচি আর বেগুনভাজা হয়। মাঝে মধ্যে খেয়েছি। লুচির ময়দা মাখাতে হয় অন্যরকম ভাবে, বুঝলেন? তাকে বলে ময়ান।
তাহলে এগুলো কি? টেবিলের ফোলা পরোটার প্লেটের দিকে আঙুল দেখিয়ে আশরাফুদ্দৌলা বলল।
এগুলো ভাই পরোটা নয়, এগুলো হল কেমিক্যাল!
কেমিক্যাল? ঘোলাচোখে বিস্ময় তুলে বলে উঠল আশরাফুদ্দৌলা।
হ্যাঁ।
মিথ্যে কথা!
কী বললেন? যেন আশরাফুদ্দৌলার কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল মনিরুজ্জামান।
হ্যাঁ, মিথ্যে কথা। কারণ পরোটা ফুলবে! তার কারণ আমিও বাড়িতে প্রতি সপ্তাহে নাস্তার টেবিলে পরোটা খাই। সবসময় ফোলা পরোটাই খাই।
এরকম ভাবে ফোলা? একটু যেন অবাক হয়ে বলে উঠল মনিরুজ্জামান।
আলবৎ! এরকমই ফোলা।
তাতে কোনো কেমিক্যাল মেশানো হয় না?
প্রশ্ন শুনে নাক দিয়ে একটা শব্দ বের করল আশরাফুজ্জামান, যার অর্থ এত অবান্তর প্রশ্নের জবাব দেবার কি কোনো দরকার আছে?
সত্যি বলছেন আপনার পরোটা সবসময় ফোলে? মনিরুজ্জামান নাছোড়বান্দা।
বটেই তো, যতবার আমি বাড়িতে পরোটা খেয়েছি, এরকম ফোলা পরোটাই খেয়েছি। যদি কোরান হাতে শপথ করতে বলেন তো তাই করবো!
আমিও কোরান হাতে শপথ করে বলছি, আমার বাড়ির পরোটা ফোলে না, কোনোদিন ফোলেনি।
আপনার স্ত্রী কি নিজের হাতে ময়দা মাখান, নিজের হাতে পরোটা ভাজেন? জিজ্ঞেস করল এবার আশরাফুদ্দৌলা।
নয় তো কি? আমার খাবারটা সবসময় সে নিজের হাতেই তৈরী করে, এজন্যে সে কাজের মেয়ের ওপর নির্ভর করে না। কোনোদিন করেনি। বিয়ের পর থেকে রেগুলার পরোটা খাচ্ছি, কোনোদিন ফোলা পরোটা খাইনি! একদিন জিজ্ঞেস করতে সে বলে, ফোলা পরোটা করা যায় কেমিক্যাল মেশালে, আমি তোমাকে সেটা খেতে দেবো না। খেলে তোমার কিডনি নষ্ট হয়ে যাবে।
আমার স্ত্রীও আমার যাবতীয় খাবার দাবার নিজের হাতে তৈরী করে। এমন কি সরবৎও নিজের হাতে করে সে। কী পরিমাণ মিষ্টি দেবে সেটা তার মুখস্ত, আর কেউ তা পারে না। আশরাফুদ্দৌলা তার পয়েন্ট স্থির থাকল।
তাহলে বলছেন আপনার বাড়ির পরোটা ফোলে? এবার হুইস্কিতে একটা লম্বা চুমুক দিল মনিরুজ্জামান।
হ্যাঁ, ফোলে। প্রতি সপ্তাহের শনিবার আমি ফোলা পরোটা দিয়েই নাস্তা করি। বলল আশরাফুদ্দৌলা।
এইরকম ফোলা? টেবিলে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল মনিরুজ্জামান।
অবশ্যই!
আপনি মিথ্যে বলছেন! আপনি প্রত্যেক সপ্তাহে পরোটা খান, আর আমি প্রতিদিন। এবার যেন গর্জন করে উঠল মনিরুজ্জামান। বড় হোটেলের এটিকেট আর যেন ধরে রাখা যাচ্ছে না।
চুপ করেন, চাপা গলায় বলে উঠল আশরাফুদ্দৌলা, লোকে শুনতে পাবে।
তার আমি থোড়াই কেয়ার করি। আপনি আমাকে ফাঁকি দিয়ে মিথ্যে কথা বলতে পারবেন না। মিথ্যে বলে চ্যাপ্টা পরোটা আপনি ফুলিয়ে দিতে পারবেন না! এভাবে জোর করে আপনি চ্যাপ্টা পরোটা ফোলাতে পারবেন না!
পারবো না? আপনি বলছেন? চোখ পাকিয়ে বলে উঠল আশরাফুদ্দৌলা।
হ্যাঁ, কারণ রোজ সকালে আমার স্ত্রী চোখের সামনে ডালডা দিয়ে পরোটা ভেজে তোলে। আমি ডাইনিং টেবিলে বসে সব দেখি। ভাজার সাথে সাথে পরোটা টেবিলে চলে আসে। আপনার মত সপ্তাহে সপ্তাহে পরোটা ভাজে না!
কী বললেন? ডালডা? আপনার স্ত্রী ডালডা দিয়ে পরোটা ভাজেন?
হ্যাঁ, তাই ভাজেন এবং আমার চোখের সামনে ভাজেন।
আর আমার স্ত্রী পরোটা ভাজেন খাঁটি গাওয়া ঘি দিয়ে। আর সেই পরোটা ফুটবলের মত ফোলে! রোজ খান বলে ডালডা দিয়ে ভাজেন। আমার মত সপ্তহে একদিন খেলে গাওয়া ঘি দিয়ে ভাজবেন। আর পরোটা আপনার চোখের সামনেই।
এবার ক্ষেপে উঠল মনিরুজ্জামান। বলল, তার মানে আপনি কী বলতে চাচ্ছেন, আমার ক্ষমতার ওপর কটাক্ষ করতে চাচ্ছেন? বলতে চাচ্ছেন যে প্রত্যেকদিন ঘি দিয়ে পরোটা ভেজে খাবার মত ক্ষমতা আমার নেই? আরে সাহেব, আপনি আমাকে চিনেছেন কতটুকু? ক্যানাডায় বাড়ি কিনে রেখে আমি সেই বাড়ি ভাড়ায় রেখেছি জানেন?
হঠাৎ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল মনিরুজ্জামান। কিন্তু টলে পড়ে গেল মেঝেয়।
আধঘন্টা পর দু’জন বেয়ারা চ্যাংদোলা করে মনিরুজ্জামানকে তুলে দিল গাড়িতে। মনিরুজ্জামান বাড়ি ফিরে যেতে যেতে আশরাফুদ্দৌলার দিকে তাকিয়ে বলল, এই শালার রেস্টুরেন্টে আর কখনো আসবো না। শালা, পরোটা ভেজে রাখে লুচির মত করে! শালারা দেশটাকে আমেরিকা পেয়েছে, যতসব ভাঁওতাবাজি! শালা, দুরমুশ চেনে না! এবার ফের এরকম পরোটা টেবিলে নিয়ে এলে বেটাকে-
যা বলেছেন। তবে আর কোনো দিন এখানে আসবো না। আগামীকাল আমরা দক্ষিণের দিকে একবার ট্রাই করবো, শুনেছি সেখানে নতুন একটা হোটেল খুলেছে। সেটাও ফাইভস্টার। স্বাধীন দেশে কি হোটেলের অভাব? শুনেছি সেখানে বেস্ট রেড ওয়াইন পাওয়া যায়। আপনি কী বলেন? রোজ রোজ হুইস্কি বোধহয়-
ঠিক, আপনি ঠিক বলেছেন।
আশরাফুদ্দৌলার দিকে ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে বলল মনিরুজ্জামান।


960 Comments