বইমেলা ২০১৯: আড্ডা এবং শব্দের সুবাস :: কামরুল হাসান



ইচ্ছে ছিল বিকেল পাঁচটার ভেতর বইমেলায় পৌঁছাব। নগরের ট্রাফিকজ্যামে পড়ে দেরি হলো অনেকটাই। তখন শর্টকাট পথ ধরি। এই শর্টকাট হলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পথ। পাতাঝরা সে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে আমি বিমোহিত হয়ে পড়ি আর মনে মনে বলি, পাতাকুড়ুনি মেয়েগুলো কই? এই উদ্যান ঘিরে নগরীর যতগুলো সড়ক গেছে তার সবগুলোতেই সশব্দে ছুটে চলেছে যন্ত্রযান। চারপাশের ঐ শব্দদূষন আর ভীড়ের মাঝে এই নৈঃশব্দ্য আর নির্জনতা কী মনোহর বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। নিচু ও বৃত্তাকার ইটনির্মিত বেদীতে বসে গল্প করছে যুবকেরা, কোথাও সেই কোনকালে বানানো সিমেন্টের ছাউনির নিচে আড্ডা দিচ্ছে মানুষেরা, পাতাঝরা উঠোনে প্রাণের লেনদেনে মেতেছে প্রেমিকযুগলেরা। সেসব এড়িয়ে দৃঢ়পদক্ষেপে এগুই উদ্যানের ভেতর নির্মিত সিমেন্টের রাস্তা ধরে। দেখি একটি জায়গায় অনেকগুলো পামট্রি ঘণ হয়ে দ-ায়মান, দেখে মনে হলো একপায়ে দাঁড়ানো জড়োবদ্ধ সারসদল। পাখনার ভাঁজে তাদের লুকানো পা’টি না খুঁজে আমি বিপুল উঁচু স্বাধীনতা স্তম্ভের দিকে এগুই। পামট্রিগুলোর ওপাশে সাদা দেয়াল চলে গেছে উত্তর থেকে টানা দক্ষিণে, তার গায়ে টেরাকোটার লাল শিল্প, কিন্তু আমার দেখার সময় নেই। আমি ভাবি যে উদ্যানে  কোন এককালে রেসের ঘোড়ারা ছুটেছে বাজির টাকা অন্যকে পাইয়ে দিতে,  উনিশশ একাত্তরের সাতই মার্চ যে উদ্যান লক্ষ লক্ষ মানুষের সম্মিলনে এক জনসমুদ্র হয়েছিল, যেখানে স্বাধীনতার অমর কবিতাটি পাঠ করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, যে উদ্যানে স্বাক্ষরিত হয়েছিল পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের দলিল সেই ঐতিহাসিক উদ্যানটি নাগরিক নকশায় অনেক পাল্টে গেছে। ঐ মনোহর শিরউঁচু স্বাধীনতার স্তম্ভ সেই সুনন্দ নকশার এক উজ্জ্বল বাতিঘর। তার লাগোয়া যে কৃত্রিম জলাধার তার চারপাশে বিকেলবিলাসী মানুষের ভীড়, সেই ভীড়ের মাথার উপরে বইমেলার বিভিন্ন স্টলের আলো চোখে প্রতিফলিত হয়। চওড়া পথটি এক জলশূন্য পুকুরের উপর দিয়ে গেছে, তার দুপাশে পোড়ানো হচ্ছে শুকনো পাতা আর শুকনো গুল্ম, আগুন জ¦লছে, ধোয়া উড়ছে,  এক পুলসিরাত যেন। বইমেলার পথে ঐ আমার অগ্নিপরীক্ষা!

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দিয়ে প্রবেশের পথটি উদ্যানের মতোই নির্জন! কথাটি কি ঠিক হলো? প্রায় দু’কোটি লোকের (হা ঈশ্বর! পৃথিবীর অন্ততঃ পঞ্চাশটি দেশে দু’কোটি লোক নেই) মহানগরে নির্জনতা বলতে কিছু নেই। লোকেরা আছে সর্বত্র, তাই নির্জনতা বলতে কমসংখ্যক মানুষকেই বুঝি। সেই নির্জন গেটের দুপাশে পুলিশ। ক’জন নিরীহদর্শন পুরুষ পুলিশের পাশে দুজন স্নিগ্ধদর্শন নারী পুলিশ দেখে দু’ধরণের প্রতিক্রিয়া হলো মনে। বইমেলার উত্তর সীমানার প্রাচীর ঘেষে যে পথ গেছে প্রগলভা স্টলগুলোর বাড়ানো বাহুর প্রান্ত ছুঁয়ে তা ধরে কিছুটা এগুতেই চোখে পড়ে গীতিকার ও কবি শহীদুল্লাহ ফরাজীকে। জলাধারের পাশে বসে আছেন আরও চারজন। এরা হলেন চিত্রশিল্পী ও লেখক সৈয়দ লুৎফল হক, অনুবাদক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া, এম নজরুল ইসলাম এবং এ্যডর্ণ পাবলিশার্সের কর্ণধার জাকির হোসাইন। পরিচয় করিয়ে দেবার সময়ে জাকির হোসাইন আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়াকে বাংলাদেশের একমাত্র জীবিত দার্শনিক এবং এম নজরুল ইসলামকে সিরিয়াস পাঠক হিসেকে পরিচিত করালেন। শেষোক্তজন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত করাতেই বেশি আগ্রহী। আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া গতবছর অনুবাদের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন। আমি গিয়ে বসলাম অর্ধবৃত্তের ঠিক মাঝখানে, অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার বারোটার ঘরে। পরিচয়পর্ব শেষ হলে এক যুবক আমাকে এক কাপ চা এগিয়ে দেয়। সে চায়ে না আছে দুধ, না আছে চিনি। ‘বইমেলায় আমরা বইকেই চিনি মনে করি’, বল্লেন জাকির ভাই। দুধ ও চিনিহীন চা আমি পান করতে পারি না, প্লাস্টিকের স্বচ্ছ কাপটিকে নামিয়ে রাখি নিচে। বলি, ‘দুধ নেই, চিনি নেই, এ চা বানাতে তো তেমন খরচই পড়েনি’। ‘এ চা একদমই সস্তা, কারণ পেছনেই গরম পানি পাওয়া যায়’- বল্লেন সুরসিক জাকির হোসাইন। ঐসব ঠাট্টামস্করা ফেলে আমাকে এগুতে হয়। কেননা আমাকে লেখকমঞ্চে  যেতে হবে।
এবছর এই প্রথম লেখক-পাঠকদের মুখোমুখি করানোর ব্যবস্থা করেছে বাংলা একাডেমী। প্রতিদিন পাঁচজন নির্বাচিত লেখকের বই নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই মঞ্চটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উত্তর-পূর্ব কোণে অনেকটা ফাঁকা জায়গায়। খয়েরি রঙের ম্যাট বিছানো কাঠের নিচু কয়েকটে ধাঁপের উপর হালকা নীল ম টির উপর দুটি চেয়ার একটি নিচু টেবিল পাতা। পেছনের দেয়ালটি তেরি করেছে চিকণ বাঁশের ঘনসন্নিহিতি। সে দেয়ালের একপাশে বাংলা একাডেমী ও বইমেলার লোগো, অন্যপাশে লেখা ‘লেখক বলছি…’।  মঞ্চের ডানপাশে পাঁচ ভাষাশহীদের ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনীসম্বলিত প্লাকার্ড।
এই প্রথম এখানে আসা। আমার ধারণা ছিল অনুষ্ঠানটি সাড়ে পাঁচটায় শুরু হবে। আমি পৌঁছেছি ঠিক সাড়ে পাঁচটায়। সঞ্চালকের কথা থেকে জানলাম প্রথম যিনি বলেছেন তার অংশটুকু শেষ, তিনি ডাকছেন দ্বিতীয় লেখক কথাসাহিত্যিক মাহবুব আজীজকে। সমুখের সারিতে ষাটের অন্যতম কবি মাহবুব সাদিককে উপবিষ্ট দেখলাম। তিনি আমার প্রিয় মানুষ, আমি তার পাশে গিয়ে বসি। তিনিই যে প্রথম বক্তা ছিলেন আমি জানতাম না। জেনে এই জ্ঞানী কবির কথা শুনতে না পারার জন্য আফশোস হলো। মাহবুব আজীজের সাক্ষাৎকার নিতে এলেন তরুণ প্রাবন্ধিক ও গবেষক মোজাফফর হোসেন। এবছর কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে মাহবুব আজীজের উপন্যাস ‘এইসব কলহাস্য’। প্রধানত এই উপন্যাস একং মাহবুব আজীজ রচিত অন্যান্য উপন্যাস ঘিরে প্রশ্ন সাজালেন মোজাফফর হোসেন। লেখকের উপন্যাসসমূহের নায়কদের দুঃখবাদী চরিত্র আখ্যায়িত করে কেন তারা এত দুঃখী, কেন তারা একাকীত্ব চায়? -জানতে চাইলেন উপস্থাপক। মোজাফফরের এ বক্তব্যের সাথে একমত না হয়ে আজীজ জানালেন জীবন আনন্দময়। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘একটাই জীবন। চুমুকে চুমুকে বাঁচো’। তবে তিনি স্বীকার করেন জীবন, যাকে তিনি তুলনা করলেন দুই অসীমের মাঝে এক মুহূর্তের বিন্দুর মতো, মূলত বেদনাময়, বিপন্ন। উপন্যাসে রচিত জীবন আর তার ব্যাখ্যা- এক স্ববিরোধ সৃষ্টি করল। উপন্যাসের চরিত্রদের মধ্য দিয়ে লেখক মূলত নিজের জীবনভাষ্য লিখলেও সে লেখায় একধরণের নৈর্ব্যক্তিকতা রয়েছে মোজাফফরের এ মন্তব্যের সাথে একমত হয়ে মাহবুব আজীজ বল্লেন, তার অভিপ্রায় লেখাকে নৈর্ব্যক্তিক থেকে রাজনৈতিক করে তোলা। বিশ^সাহিত্যের পাঠ নেয়া মোজাফফর, যিনি মাঝে মাঝে মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট, জাপানী ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি প্রমুখের উদ্ধৃতি দিচ্ছিলেন তিনি যোগ করলেন আইরিশ ঔপন্যাসিক জেমস জয়েস একেই বলেছেন, philosophically political।
কথাসাহিত্যের এই প্রবাহে কোথায় আপনার লেখা স্বতন্ত্র, নিজস্ব বাঁক নিয়েছে?’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বল্লেন, প্রত্যেক লেখকের লেখার চোখটি আলাদা, লেখার ধরণও আলাদা। কোথায় তার স্বাতন্ত্র্য তা বলবে সমালোচক ও পাঠক। ‘আমি অর্থহীন সাহিত্য রচনা করতে চাই না’ বলে তিনি জানালেন, ‘মানবজীবনে লেখালেখিই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, তা টিকে থাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এক সেতুবন্ধ হয়ে। আর সবই অর্থহীন।’ এ মন্তব্যের সম্পুরক হিসেবে একজন শ্রোতা প্রশ্ন করলো জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে হলে কী প্রয়োজন? পেছনের সারিতে বসেছিলেন ভ্রমণকাহিনী লেখক শাকুর মজিদ। তিনি এই লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে বল্লেন এরূপ বিনিময় আরও হওয়া উচিৎ। দেরিতে হলেও এ উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানালেন। বল্লেন, বইমেলা কেন শুধু প্রকাশকের মেলা হবে। বইমেলা হবে লেখকেরও, এখানে লেখকের বিস্ফোরণ ঘটবে। মাহবুব আজীজের উপন্যাসকে তিনি আত্মজৈবনিক বলে আখ্যায়িত করলেন।

এ অধ্যায় শেষ হলে কবি মারুফ রায়হানকে নিয়ে মঞ্চে আসেন তরুণ প্রাবন্ধিক ও গবেষক রেহানা পারভীন। আশির দশকের শেষভাগ থেকে দেখছি মারুফ রায়হান হলিউডের কাউবয় নায়কদের মতো অবিকল হ্যাট পরে বইমেলায় ঘুরে বেড়ান। ব্যক্তিগত আলাপে জেনেছি মস্তককে শীতের দংশন থেকে রক্ষা করতেই তার এই সুরক্ষা নেয়া। পোষাকআষাকে অত্যন্ত সচেতন এই কবিকে তার মাথার হ্যাট দেখেই চেনা যায়, যদিও টেলিভিশনের অত্যন্ত পরিচিত মুখ তিনি। আজও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। শুরুতেই উপস্থাপিকা মারুফ রায়হানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে জানালেন, তিনি আঠারোটি কাব্য ও দুটি উপন্যাসের রচয়িতা। উপস্থাপিকার প্রাথমিক মন্তব্য ‘বইমেলায় সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয় কবিতার বই, আর সবচেয়ে বেশি কবিতা লেখে তরুণরা’ -প্রসঙ্গে মারুফ বল্লেন, আমরা কমবেশি সকলেই গান গাই। কিন্তু মঞ্চে গাইতে হলে প্রস্তুতি নিতে হবে, সারগাম শিখতে হবে। কবিতার সারগাম হচ্ছে ছন্দ। নবীন কবিকে কবিতার ভাষা, ছন্দ, ব্যাকরণ, উপমা, চিত্রকল্পসহ অলঙ্কারসমূহ জানতে হবে। অনেক নতুন কবি পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে আসেন, অনেকে নিয়ে আসেন না।
উপন্যাস লেখা প্রসঙ্গে মারুফ জানালেন জীবনের বৃহত্তর পরিসরটিতে ধরতে হলে, অনেক চরিত্রকে ধারণ করতে হলে উপন্যাসের কোন বিকল্প নেই। তার প্রথম উপন্যাস ‘রানি ও কেরানি’ মাত্র পঁিচশ দিনে লিখেছিলেন। যদিও দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সোহাগপুর’-এর নব্বই পৃষ্ঠার একটি ক্ষুদ্ররূপ একটি পত্রিকার ঈদসংখ্যায় ছাপতে দিয়েছিলেন, তবু সে উপন্যাসটি তিনি আজো লিখে শেষ করতে পারেননি। সোহাগপুর হলো বিধবাদের গ্রাম। ১৯৭১ সালে জামালপুর জেলার এ গ্রামের সকল পুরুষকে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। বাংলাদেশে পাকবাহিনীর গণহত্যায় সোহাগপুর তাই বিশিষ্ট। মারুফ রায়হানের প্রথম উপন্যাসটি ছেপেছিন ‘চিত্রা’ নামের এক প্রকাশনী। ঐ বই দিয়েই প্রকাশনীটির যাত্রা শুরু। এ বইমেলায় চিত্রা এনেছে একই মলাটে তার একটি উপন্যাস, একটি কাব্য ও একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। যাকে বলে একের ভিতর তিন।
‘আঠারোটি কাব্যের ভিতর কোন গ্রন্থটি পাঠককে চিনিয়ে দিবে এটি মারুফ রায়হানের বই?’ আমার প্রশ্নে মারুফ রায়হান কবি শামসুর রাহমানের একটি আলাপনের প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। তাঁর শেষের দিকের কাব্যসমূহকে কোন কোন সমালোচক কম গুরুত্ব দিলে শামসুর রাহমান বলেছিলেন, তাঁর প্রতিটি নতুন কাব্যে অন্ততঃ দশটি নতুন কবিতা থাকে। সুতরাং নিজেকে অতিক্রম করে যাওয়াই কবির অভীষ্ট। কেউ পারেন, কেউ পারেন না। নিজের প্রতিনিধিত্বমূলক বই হিসেবে তিনি বেছে নিলেন তার প্রথম কাব্য ‘স্বপ্নভস্মের চারুকর্ম’। এ প্রসঙ্গে বল্লেন, ‘আমি মনে করি প্রত্যেক কবির প্রথম গ্রন্থ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কাব্য চিনিয়ে দেয় কে কবি, আর কে কবি নয়। তবে সত্যিকার চ্যালেঞ্জ হলো দ্বিতীয় কবিতার বইটি বের করা। কারণ সেখানেই বোঝা যাবে তিনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারছেন কিনা। তিনি লেখাও চালিয়ে যেতে পারবেন কিনা।’ আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল সাম্প্রতিক বিষয়কে কী করে শ্লোগান না বানিয়ে কালোত্তীর্ণ করে তোলা যায়? অসংখ্য টিভি ক্যামেরার মুখোমুখি স্বচ্ছন্দ মারুফ রায়হান সাবলীলভাবে এ প্রশ্নেরও উত্তর দিলেন।
এ পর্বে শ্রোতাদের মধ্য থেকে একমাত্র আমিই প্রশ্ন করলাম। আশ্চর্য আর কেউ কোন প্রশ্ন করলো না। যারা বসেছিল তাদের কয়েকজন হলেন পরের পর্বগুলোর লেখক কিংবা আলোচক। দর্শকের উপস্থিতি মোটামুটি হলেও একেবারে বিশুদ্ধ শ্রোতা ছিলেন তুলনামূলকভাবে কম।
শনিবার লেখকমঞ্চের চতুর্থ লেখক ছিলেন কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান। তার সঞ্চালক আরেক কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান। দুই কথাসাহিত্যিকের কথার লড়াই দেখার জন্য আমরা যারা রয়েছি তাদের অনেকেই লেখালেখির সাথে যুক্ত। সামান্য দূরেই বাংলা একাডেমীর বইমেলার খাবার স্টল। সেখানে যত মানুষ, তার অর্ধেকও নেই এখানে। বুঝি তারা প্রথম কড়িটি জোগাড় করতে পেরেছে, দ্বিতীয়টি এখনো পারে নি। আর আলোচনার চেয়ে খাদ্য সর্বদাই বেশি টানে মানুষকে।
পাপড়ি রহমান বহুলপ্রজ লেখকদের বিপরীত। এ বছর বইমেলায় প্রকাশিতব্য তার  ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’  উপন্যাসটি  আটবছর ধরে লিখেছেন। আমার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়লো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের এক যুগ ধরে লেখা মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘একশ বছরের নিঃস্তব্ধতা’র কথা। পাপড়ি রহমানের প্রথম উপন্যাস  ‘পোড়া নদীর স্বপ্নপূরণ’ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। ‘বয়ন’ প্রকাশিত হয় এর চার বছর পরে ২০০৮ সালে। এর তিন বছর পর প্রকাশিত হয় পালাটিয়া। বোঝাই যায় তিনি সিরিয়াস লেখক। সঞ্চালক স্বকৃত নোমান মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদাহরণ টেনে বললেন বাংলা উপন্যাসের ঐ অমর প্রতিভা পাঁচ বছরে লিখে ফেলেছিলেন তাঁর কালজয়ী পাঁচটি উপন্যাস। তিনি পারলে পাপড়ি রহমান কেন পারেন না? মানিক অসম্ভব প্রতিভাবান, তার সাথে তুলনা চলে না- পাপড়ি রহমানের বিনয়ী উত্তর।
নোমানের আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন লেখার আগে চরিত্রগুলোর স্কেচ আঁকা, যেমনটা করেন অনেক লেখক, জরুরি। চরিত্রের মুখের নিখুঁত ছবি, গায়ের রঙ, চুলের বর্ণ, দেহকাঠামো, চলাফেরা ইত্যাদি সব হয় ছবিতে কিংবা মনশ্চক্ষে এঁকে ফেলা প্রয়োজন। বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া লেখা যায় না- পাপড়ি রহমানের এমন মন্তব্যের জের টেনে তার উপন্যাসে যেসকল প্রেমের ঘটনা দেখা যায়, সেসব তার বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল কি না নোমান জানতে চাইলেন, অর্থাৎ প্রেমের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য লেখক প্রেম করেন কি না। নোমানের প্রশ্ন করার ধরণ একটু আগ্রাসী মনে হলেও তা ছিল আন্তরিক ও কৌতুকময়। একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্নটি পাপড়ি রহমান এড়িয়ে গেলেন। বললেন প্রেমের অনেক অভিজ্ঞতা চারপাশের মানুষদের কাছ থেকেও শোনা যায়। লেখার জন্য না হলেও জীবনে প্রেম তো এসে যায়। এক জীবনে আমরা বারংবার প্রেমে পড়ি।
‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ উপন্যাসটি বুড়িগঙ্গার ওপাড়ের মানুষের জীবন নিয়ে রচিত। নদীটির এপাড়ে যে নাগরিক জীবন, ওপাড়ে তা একেবেরেই আলাদা। সে জীবনকে প্রত্যক্ষ করার জন্য তিনি অনেকবার বুড়িগঙ্গার অপরতীরে গিয়েছেন, সেখানে ঐ নামের একটি আবাসন প্রকল্পের খবর নিয়েছেন। এর আগে তাঁতিদের জীবন নিয়ে রচিত তার উপন্যাস ‘বয়ন’ লেখার সময়েও তিনি জামদানী তাঁতিদের নিয়ে অধ্যয়ন করেন।  পালাটিয়া লিখেছেন পালাকারদের জীবন নিয়ে।  চলচ্চিত্র ও উপন্যাসের ভেতর উপন্যাসকে তিনি বেশি জটিল মনে করেন। কেননা, চলচ্চিত্রে একেকজন একেকটি চরিত্র অভিনয় করে, উপন্যাসে লেখককে সবগুলো ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়। নিজের লেখা চরিত্রদের মাঝে একেবারে ডুবে থাকেন এ লেখক, তাদের দুঃখে কাঁদেন, তাদের সুখে হাসেন। চরিত্ররা কি আপনাকে ঘুমের ভিতর ডিস্টার্ব করে, স্বকৃত নোমানের এক প্রশ্নের উত্তরে উপরের কথাগুলো বলছিলেন। তার এক উপন্যাসে চার শিশু সন্তানসহ এক দুঃখিনি মা আত্মহত্যা করে। উপন্যাসে বর্ণিত হবার পরে তিনি সাতদিন ঘুমাতে পারেন নি, অনেকবার কেঁদেছেন। উপন্যাসটি যিনি কম্পোজ করেছিলেন সেই কম্পোজিটরও নাকি অঝোরে কেঁদেছেন, বলেছেন আপনার বই আমি আর কম্পোজ করবো না। কেননা, এত দুঃখ আমার প্রাণে সয় না।
‘বাংলা উপন্যাসের ভবিষ্যত কী?’ নোমানের প্রচলিত প্রশ্নে পাপড়ি রহমান বলেন, বাংলা উপন্যাসের ভবিষ্যত উজ্জ্বল। কেননা, এ দেশে লিখবার এত বিষয়, কখনো বিষয়ের সংকটে পড়বেন না ঔপন্যাসিকগণ। নোমান জিজ্ঞেস করেছিল ফেসবুকের ছবি আর ছোট পোস্টের এই অস্থিরকালে পাঠক কেন ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস পড়বে? ডিজিটাল পৃথিবীতে আদৌ ছাপানো বই থাকবে কী না? পাপড়ি রহমান জানালেন যা আমি স্পর্শ করতে পারি না তার প্রতি আমার কোন অনূভূতি জাগে না। এ জন্যই ছাপানো বই টিকে থাকবে (ইকমার্সের যুগে যেমন টিকে আছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর)।
ইশরাত তানিয়া দুটি প্রশ্ন করলেন। তিনি পাপড়ি রহমানের বন্ধু, দুজনে এসেছেনও একসাথে, বসেও ছিলেন একসাথে। তাই প্রথমেই নিজেকে বিযুক্ত করে নিতে বললেন আমি লেখক হিসেবে প্রশ্ন করছি। তার প্রথম প্রশ্ন উপন্যাসে নিরীক্ষার জায়গা কোনটি? দ্বিতীয় প্রশ্ন নবীন লেখকদের জন্য পাপড়ি রহমানের পরামর্শ কী?। দ্বিতীয় প্রশ্নটিকে প্রথম ধরে পাপড়ি রহমান বলেন, পরামর্শ দেবার আমি কে? নিরীক্ষা প্রসঙ্গে বলেন, লেখকের একটি তৃতীয় নয়ন (Third Eye) থাকে। তৃতীয় নয়নই পথ দেখিয়ে দিবে। নিরীক্ষাকে তিনি লেখনরীতি (writing style) বলতে চান। প্রত্যেক লেখকেরই একটি নিজস্ব স্টাইল থাকে। স্বকৃত নোমান প্রশ্ন করতে যতটা আগ্রহী, পাপড়ি রহমান ততটাই অনাগ্রহী। নোমানের শেষ প্রশ্ন ছিল জনপ্রিয় সাহিত্য আর সিরিয়াস সাহিত্যের মাঝে কী পার্থক্য? প্রশ্নের সাথে জাপানী ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি ও কলম্বিয়ার নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ যারা দুজনেই সিরিয়াস সাহিত্য লেখেন অথচ তাদের বই সারা পৃথিবী জুড়ে লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রয় হয়, অর্থাৎ তারা প্রবল জনপ্রিয়। পাপড়ি রহমান এ প্রশ্নটির খুব সুন্দর উত্তর দিলেন। বললেন, জনপ্রিয় হবে না, হবে তরল। তরল বনাম সিরিয়াস সাহিত্য। তরল সাহিত্য হলো সেটা যা আজ পড়লাম, আগামীকাল ভুলে গেলাম। সিরিয়াস সাহিত্য হলো ঐ যে কবিগুরু বলেছিলেন, ‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’।
আজকের লেখক-পাঠক মুখোমুখির পঞ্চম বা শেষ লেখক কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক কুমার চক্রবর্তী। তার সাথে মুখোমুখি হতে এলেন কবি ফারহান ইশরাক। সরকারের উচ্চপদে আসীন কুমার চক্রবর্তী কী যেন চিবুচ্ছিলেন। টেনশন কাটাতে কি? তিনি নিজেকে একটু লুকিয়েই রাখেন, মনে হলো এইসব মঞ্চ তাকে খুব বেশি স্বস্তি দেয় না। কথা বলার চাইতে তিনি লিখতেই বেশি পছন্দ করেন। নব্বই দশকের এ নিভৃতচারি কবি বেশ পরিশ্রমী। তিনি বহুমাত্রিক। তাকে যিনি প্রশ্ন করছিলেন সেই ফারহান ইশরাকও জটিল বিষয় পছন্দ করেন, তিনি কুমার চক্রবর্তীতে মুগ্ধ, তার প্রশ্নের পরিভাষা কুমার চক্রবর্তীর লিখিত বিষয়সমূহের মতোই জটিল। বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা (intellectual discourse) হিসেবে তা মন্দ নয়, কিন্তু সাধারণ পাঠকের সাথে তা আদৌ কোন সংযোগ তৈরি করবে কি? আমার এ প্রশ্নকে দারুণ ক্ষীপ্রতায় এড়িয়ে গেলেন কুমার চক্রবর্তী। তিনি বললেন, সেখানে উপস্থিত সকল শ্রোতাকেই তার বিদগ্ধ মনে হয়, তিনি কাউকেই সাধারণ মনে করেন না। আমার প্রশ্নের বাউন্সারে তার হুক দুর্দান্ত হলেও আমি ভিন্ন বিদগ্ধজনদের কেউ কোন প্রশ্ন করলেন না।
আলোচনার প্রথমেই লেখকের ‘অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা’ গ্রন্থ প্রসঙ্গে উপস্থাপক বাংলাদেশের সাহিত্যে ‘অখ- বিষয়ের উপর জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার’ অভাব রয়েছে বললেন। বইটি সে অভাবের কিছুটা মিটিয়েছে। শ্রোতারা প্রথমে বোঝেনি অখ- বিষয়ের উপর জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনা বিষয়টি কী। উপস্থাপকের কয়েকবার সেটি পুনরুক্ত করার ফলে মগজে ঢুকে গেল। এক প্রশ্নের উত্তরে লেখক জানালেন তিনি শতভাগ দুঃখবাদী, শতভাগ নৈরাশ্যবাদী মানুষ। তিনি মনে করেন মানুষ দুঃখ নিয়েই বাঁচে। এরপর যোগ করলেন নান্দনিক হতাশাবোধ নিয়েও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। তিনি জানার চেষ্টা করেছেন আত্মহত্যাকারীর মনে কী চেতনাপ্রবাহ কাজ করে।  আত্মহত্যাকারী যেহেতু আগাম কোন ঘোষণা দেয় না, তাই তার মনোভঙ্গি জানা কঠিন নয় কি? আমার এ প্রশ্নে তিনি বইটি রচনার সময় তার মানসিক ও স্থানিক অবস্থার উল্লেখ করে বলেন আত্মহত্যা নিয়ে তিনি কোন গবেষণা করছেন না। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে আত্মহত্যাকে যেভাবে নিন্দনীয় করে দেখানো হয়, বিষয়টি তেমন নিন্দনীয় নয়।
কুমার চক্রবর্তীর একটি কাব্যগ্রন্থের নাম ‘অধিবিদ্যা সিরিজ’। সে গ্রন্থের প্রভাবেই কি না ফারহান বারংবার কুমার চক্রবর্তীর লেখায় অধিবিদ্যার উল্লেখ করছিলেন। কবি এর ব্যাখ্যায় বলেন অধিবিদ্যা বা metaphysics হলো মুহূর্তের উন্মীলন, physics of presence। এই ব্যাখ্যা শুনে আমার পাশের জন মুখের দিকে তাকালেন। তার চোখে প্রশ্ন। তার লেখা অধীত বিদ্যার পঠনের প্রতিফলন নাকি যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা? ফারহানের এ প্রশ্নে কুমার চক্রবর্তী বলেন, আমি একটি প্রপঞ্চ, আমি যে গাছটি দেখছি সেটি একটি প্রপঞ্চ। গাছ নয়, গাছটি একটি প্রতিভাস হয়ে আমার ভেতরে প্রবেশ করছে। বস্তুপ্রপঞ্চ ও ভাবপ্রপঞ্চের মাঝে যে দার্শনিক প্রত্যয় তাকেই ভুয়োদর্শন বলা হয়। ভাষার সীমাবদ্ধতা আছে।  Language is the first perversion of senses, কেননা ভাষা ইন্দ্রিয়জ অনুভূতিকে যথার্থভাবে ফোটাতে পারে না। আলোকিত মঞ্চে ঐ দার্শনিক ডিসকোর্স চলছে আর উঠোনে আমরা ডুবে আছি অন্ধকারে।
জিনকোড আবিস্কারের ফলে আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টিরহস্য উদঘাটনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি এই সত্যের সাথে লেখালেখির সৃষ্টিশীলতা মিলিয়ে এরপর ফারহান ইশরাক যে প্রশ্নটি করলেন সেটি শুনে কুমার চক্রবর্তী বললেন, ‘প্রশ্নটি একটু জটিল আকার ধারণ করেছে।’ ফারহান তখন চলে যান অন্য প্রশ্নে। লেখক হওয়া কি স্বতঃস্ফূর্ত নাকি কাঠামোগত চেষ্টার ফল? উত্তরে কবি বলেন, পতিত না হলে লেখক হওয়া যায় না। আমরা ভাবছি তিনি কেন পতনের কথা বলছেন? পরক্ষণেই খোলাসা হলো অসহায়ত্বের ভেতর, দুঃখের ভেতর পতিত হবার কথা। চারপাশের মানুষ থেকে নিজেকে আলাদা করতে না পারলে লেখক হওয়া কঠিন। এ হলো এমন এক গোলকধাঁধা (labyrinth) যে আপনি ঢুকতে পারবেন, বেরুতে পারবেন না। ফারহান যে সংযমের কথা বলছিলেন তার জবাবে হাসতে হাসতে কুমার চক্রবর্তী বলেন তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানেন তিনি কতখানি বেহিসাবি। সামাজিক অস্তিত্ব কী করে শৈল্পিক অস্তিত্বের সাথে সহাবস্থান করে? দর্শনজিজ্ঞাসু ফারহান ইশরাকের পরের প্রশ্ন।
ঐসব অখ- বিষয়ের উপর জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার পর শেষ হলো আজকের লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়া। দেখলাম চারটি সেশনেই আমিই একমাত্র শ্রোতা যে প্রশ্ন করে গেছে; দুটি সেশনে আমিই ছিলাম একমাত্র প্রশ্নকারী। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? প্রশ্ন নেই, উত্তরে পাহাড়।
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

643 Comments