বীজপুরুষ: বাংলা গল্পের দিগন্তে ইস্পাত ইশারা :: মনি হায়দার



‘অনুভূতির রঙিন রক্তপাতই গল্প’, গল্প সর্ম্পকে আমার সংজ্ঞা।

এখন প্রশ্ন, অনুভূতি কী? মানব মনের বহুমুখি বিচিত্র যন্ত্রনা সুখ অসুখ প্রেম কাম- কাতরতা বিষাদ হিংসা উল্লাস- অন্তজমিনের যাবতীয় ক্রীড়া ও প্বার্শপ্রতিক্রিয়াই অনুভূতি। এতো কিছুর পরও অনুভূতির প্রকারভেদ থাকতে পারে। কোনো অনুভূতি তীব্র। কোনো অনুভূতি শীতল। সবইটার নির্ভর করে মানুষটির মনঘড়ি বা দেহঘড়ির কাঁটার ওপর। দ্বিতীয় প্রশ্ন, অনুভূতির রঙ কী? গল্পের মানচিত্রে রঙ আসলে বিন্যাসের ক্যানভাস। একটি ক্যানভাসে কতো বিচিত্র রঙের ক্যানভাস ভেসে উঠতে পারে, তারই কম্পোজিশান, রঙ। আর রক্তপাত? রক্তপাত তো যে কোনো শিল্পের বাটখাড়া। অথবা বলা যায় মাপজোক। প্রশ্ন উঠতে পারে, ইশরাত ইশরাতের ‘বীজপুরুষ’ গল্পগ্রন্থের গল্প সর্ম্পকে লেখার আগে এতো মাপজোক কেনো? মাপজোকই যদি হবে, সেটা কি গল্প হবে? মাপ বা মাপকাঠি ছাড়া কি লাগাম ছাড়া কিনো শিল্প হয়? হয় না বলেই মাপ বা মাপকাঠি অনিবার্য। লাল নীল সবুজ হলুদ প্রকৃত অর্থে গল্প কাঠামোর নয়, প্রগাঢ় যুক্তি প্রযুক্তির মিশেলে জীবনের যে নামতা, সেটাই রঙ, সেটাই রক্ত, সেটাই রক্তপাত।আমরা প্রতি মুহূর্তে রক্তপাতের মধ্যে বাস করি, বেড়ে উঠি, জন্ম নিই। কিন্ত রক্ত যে কতোটা অশরীরী, শরীরের ভেতরে থাকার পরও বুঝতে পারি না। এই বুঝতে না পারাটাই গল্পের শরীর, আর গল্পকারের গল্প মানব শরীরের বায়বীয় বাতিঘর।

মনি হায়দার

ইশরাত নতুন গল্পকার। মানুষ এই সময়ের। সময়ের একটা জটিলতা থাকে, জটিলতার কালো জালে আটকা না থেকে ইশরাত জটিলতাকে চরিত্র বানিয়ে অনন্য গল্প লিখে চলেছে। অনন্য সেইসব গল্প। প্রতিটি গল্প সজাগ। ঘুমায় না ওর গল্প। যেহেতু গল্প ঘুমায় না, পাঠক বাধ্য হয়, জেগে থাকতে গল্পের সঙ্গে। পাঠককে জাগিয়ে রাখাটাই গল্পকারের কাজ। আরাধ্য বিজয়। অমৃত শ্লোকের নামতা পাঠ। লিখতে অনুপ্রাণিত বোধ করছি যে, গল্পকার ইশরাত তানিয়া আমাকেও বাধ্য করেছে, গল্প পাঠে জেগে থাকতে।

২০১৮ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলায় দেশ প্রকাশন থেকে বের হয়েছে ইশরাত তানিয়ার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘বীজপুরুষ’। ‘বীজপুরুষ’ গল্পবইয়ে জায়গা পেয়েছে ষোলোটি গল্প। নামগুলো জানিয়ে দিই: বীজপুরুষ, থার্ড আম্পায়ার, বর্তমান অবর্তমানে, নেই মানুষের উৎসভূমি, তারা ও মীনরাশির জাতক, মুরগীর রান, বাবাইয়ের এমন একটি অলৌকিক বাবুই, ফাক আপ নাইটস, আস্তাবলে কুহক, অমৃতস্যবয়ান, পদ্মবীজ ও কৃষ্ণ গহ্বর, ব্লকড আনব্লকড, ঋতু বৈচিত্র্যময়, সুন্দরীর রাজ্যে, সোয়েটার এবং সংযোগ।

সেই অনাধকিাল থেকে মানুষ বড় অসহয় মানুষেরই কাছে। একাত্তরে আমরা সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ছিলাম হার্মাদ পাকিস্তান বাহিনী আর এ দেশীয় শুকর রাজাকার আলবদর জামাতের কাছে। এখন গোটা মধ্যেপ্রাচ্য অসহায় ইসরাইলের দানবীয় বিস্তারে। আবার এই ভয় বা অসহায়ত্ব রাষ্ট্র পার হয়ে ঢুকে পড়ে ব্যক্তির জমিনে। একজন মানুষ আর একজন মানুষের কাছে কতোটা অসহায়, ইশরাত তানিয়া সেই পরিপ্রেক্ষিত এঁকেছেন, ‘অমৃতস্যবয়ান’ গল্পে। আমাদের মনে আছে নিশ্চয়ই, টঙ্গী বা গাজীপুরে এক অসহয় পিতা কিশোরী মেয়েকে নিয়ে রেললাইনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ওরা প্রমাণ রেখেছে, মৃত্যু অমৃতসমান। সেই বিদারক ঘটনার চালচিত্রে ইশরাতের গল্প….   আহা পড়ো তো চোখ ভিজে যায়, মন ডুবে যায়, মানুষ ওগো মানুষ কেনো হন্তারক হও… মানুষের প্রতি.. প্রশ্নের সঙ্গীতে গোটা বাংলাদেশ ডুবে গেলেও মেয়েটি ও তার পিতার হত্যাকারীরা মাটির উপর জন্তুর মতো এখনও দাপিয়ে বেড়ায়।

ইশরাত গল্পটা শুরু করেছে ভিন্ন রকম একটা জায়গা থেকে। মনে হচ্ছে. আমরা সবাই ভূমি চেঁছে অতলে তলিয়ে যাবার প্রতিযোগিতায় নেমেছি। আর ইশরাত লেখে- ‘ঐশ্বর্য নেই, গৌরব নেই। নেই ভাষা, ভাষ্য। তবু এক অধিকার থাকে। এমন এক অধিকার যা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা সম্ভব নয়। এটি হলো ছেড়ে যাবার, বিলুপ্ত হবার একান্ত অধিকার। চলে যাবার এই একটি অধিকার আছে বলেই ভূমি স্পর্শ করে শুয়ে আছে কেউ। উপুড় হয়ে।’

আতাহার আলী পিতা। সমাজ বা রাষ্ট্রের দানবীয় শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে কন্যাসহ এসেছে মৃত্যুর কাছে। রেল লাইনের পাশে ওৎ পেত আছে, কখন আসবে ট্রেন, ছুঁড়ে দেবে পিতা ও কন্যার শরীর, মুহূর্তে শত শত টনের ট্রেনের নিচে দুইজন মানুষ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। মরণ চিৎকারও শুনবে আশপাশের মানুষ। মানুষ? মানুষ কি আছে দুনিয়ায়? থাকলে আতাহার আলী প্রিয় আত্মজাকে নিয়ে ট্রেনের নীচে পড়বে কেনো, মৃত্যুর নয় অপমৃত্যুর সাধ গ্রহণ করবার জন্য? মূলত এই প্রশ্নের উত্তর দেবার মতো এই মানব চরাচরে কেউ জেগে নেই। সবাই ঘুমিয়ে গেছে পাথর ঘুমের দেশে। কিন্তু মানবিক বোধে সঞ্চরণশীল গল্পকার ইশরাত তানিয়া ঘুমোতে পারেন না, পত্রিকার পাতায় পাঠ করা এই নৃশংস মৃত্য সংবাদে। তাঁকে লিখতে হয় আত্মবেদনার গল্প ‘অমৃতস্যবয়ান’। প্রশ্ন, আতাহার আলীরা সভ্যতার যূপকাষ্ঠে কতো মরবে? প্রশ্নটা প্রশ্নই থেকে যাবে, কেননা, মানবজমিনের ঊষাকাল থেকেই মানুষ পরম উৎসাহের সঙ্গে হত্যা করেছে মানব। আবার মানব ভালোবেসেছে মানব। মহাকালের মানব যাত্রায় মানুষই শ্রেষ্ঠ শত্রু মানুষের, অধিবোধনের এইকালের গল্পকার ইশরাত তানিয়া প্রমাণ রাখলেন।

১৯৭১ সালে এই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ জেগে উঠেছিল, এক মহাকালের ওঙ্কার আহ্বানে- জয় বাংলার জয়। জয় বাঙালির জয়। সেই কালে এই মাটি ও জলে সাড়ে সাত কোটি মানুষ অশ্রু নদী বেদনার নোনা জলে কোটি কোটি গল্প লিখেছিল, জীবনের দামে। সেই কোটি কোটি গল্প থেকে গল্পকার ইশরাত তানিয়া একটি গল্প তুলে এনেছেন পরম যত্নে কিন্তু যন্ত্রণা কাতরতায়। গল্প ‘থার্ড আম্পায়ার’।

‘থার্ড আম্পায়ার’ গল্পের আখ্যান সাজিয়েছে অন্যভাবে, উত্তমপুরষে। গল্পের নায়িকা নয়না ব্যানার্জী একাত্তরের আগুনদিনের ঘটনা বলছে নিজের বয়ানে। নয়না বলছে- “আমি নয়না ব্যানার্জী জ্বলন্ত চিতা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। আমি এক প্রকার মৃত। মৃতের বেঁচে থাকতে নেই। পুনর্জাগরণে নিজেকে জিইয়ে রেখেছি কোন আক্রোশে, যেন বা ভুল করে, জানি না। উনিশ বছরের রক্তমাংসের দেহ ধারণ করেছি শুধু হেরে যাব না বলেই। মাথা কেমন কাদা গোলা জলের মতো ঘোলাটে। চিতা থেকে স্ফুলিঙ্গ বাতাসে ওড়ে। এক কণা আগুন আমি হৃৎপিণ্ডে গুঁজে রাখি আর ক্ষত বিক্ষত দেহ টেনে ঘন কুয়াশায় হাঁটি গত জন্মের ধুলো পথে।”

কী বলতে চায় ‘থার্ড আম্পায়ার’ গল্পের নয়না? বলতে চায় একাত্তরে সেই পাশবিক দিনরাত্রিতে এই দেশের মাটি ও জলে পাকিস্তানী কুৎসিত বর্বর কুমিরেরা প্রবেশ করেছিল, তাদের মুখে যদিও ছিল পবিত্র ধর্ম, কিন্তু শরীর চোখ আর মুখ জুড়ে ছিল নারী ভোগের প্রবল তৃষ্ণা। ঢাকা থেকে এক কাপড়ে নয়নারা চলে গেলো গ্রামে, বেঁচে থাকার আশায়। কিন্তু পাকিস্তানের পবিত্র (!) সেনাবাহিনী ওকে তুলে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। সেই  দগ্ধ সময়ের আরেক ফালি নয়না ব্যনার্জীর মুখে- “জল চাইলে কখনও মুখ ভরে গেছে প্রশ্রাবে। পেটে বাচ্চা এলে নির্বিবাদে হত্যা বেয়নেট খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। চোখ তুলে পেট চিরে ফেলা। আমাদের পরনে শাড়ি নেই। ক্যাম্পে কোন মেয়ে শাড়ি দিয়ে ফাঁস দিয়েছে, তাই শুধু পেটিকোট আর ব্লাউজ। নোংরা ছেঁড়াফাড়া। হুক নেই। হাঁ করে খোলা। তেল চিটচিটে কাঁথা, তোবড়ানো টিনের থালা-জগে দীর্ঘশ্বাস আর ফোঁপানীর বেগুনী নীল বাষ্প।”

এই আমাদের একাত্তর। আমাদের শ্রেষ্ঠ দিনের কাহিনী। সেই কাহিনীর একজন নয়না এখন হাসপাতালে, পেটে বাচ্চা। কী করবে নয়না? কোনো পথ কি সামনে খোলা আছে? ঘনঘোর অনিশ্চিত সময়ে সামনে এসে দাঁড়ায় রকিব, মুক্তিযোদ্ধা।

নয়না ব্যানার্জী জানায়- ‘নিঃসঙ্গতার পুরাতত্ত্ব খুঁড়ে রাকিব ভাই আমাকে খোঁজে। ধূসরতার জীবনে রাকিব ভাই কৃষ্ণচূড়া ঢেলে বলে, তোমাকে অভিবাদন নয়না, হে বীরাঙ্গনা। সে ছিল বড় বসন্তের রাত, বড় বিস্ময়ের। আমার এত জল ছিল জানতাম না। জোয়ারে ভাসলো কৃষ্ণচূড়া, পারুল, জারুল যেখানে যা ফুটেছিল।’

আমি এই সময়ের গল্পকার ইশরাত তানিয়াকে অভিনন্দন জানাতে চাই, কারণ, অনেক বুভুক্ষ গল্পকারদের মতো আত্মপ্রতারিত মুক্তিযুদ্ধের গল্প লিখেনি। লিখেছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী গল্প। মুক্তিযুদ্ধের মানবিক গল্প। মূলত, একাত্তরে এই মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যই ষোলোশ’ কিলোমিটার দূরের হায়েনা পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, প্রাণ দিয়েছিল ত্রিশ লক্ষ। পবিত্র মায়েদের আরও পবিত্র সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছিল দুই লক্ষ। সেই বিজর্সিত বেদনার বেদীমূলে দাঁড়িয়ে আমরা নিশ্চয়ই সর্বনাশের গল্প লিখবো না। লিখবো না নয়না রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করছে, এই আখ্যান। বিপরীত মেরুর দিকে মনন ও চেতনার স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছে ইশরাত তানিয়া, গল্পের শেষ কাঠামোয়।

“বল্‌ তো টুনটুনি, ওকে কী নাম দিই? টুই টুই,লেজ কাঁপিয়ে টুনটুনি বলে- জয়া!

তেতে পুড়ে রাকিব এলো, কার সাথে এত কথা হচ্ছে?

আমি বলি জয়ার সাথে। বুক ভরে স্বাস নিল রাকিব। মিষ্টি দুধদুধ গল্প ফোলা গাল দুটোয়। এক চিলতে সুখ কোলে নিয়ে কপালে চুমু খেল। আমাদের মেয়ের নাম রেখেছি ‘জয়া’।”

আমি লিখতে চাই, জয়া কেবল রাকিব আর নয়নার কন্যা নয়, বাংলাদেশের ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল পার হয়ে, হয়ে যায় পৃথিবীর কন্যা। গল্প গল্পকার লেখেন- ‘অনুভূতির রঙিন রক্তপাতে’ সেই অনুভূতিতে সম্পূর্ণ সমর্পিত হয়ে কথাকার ইশরাত তানিয়া প্রমান রাখলো, আমিই ঈশ্বর, আমিই জননী, আমিই ভূগোল এই মানববিশ্বের। অনুভূতির তীব্রতায় একাত্তরের বিজয়ী বাংলাদেশ নতুন প্রণোদনায় জাগ্রত হলো, ইশরাতের ‘থার্ড আম্পায়ার’ গল্পে। শেষের মন্তব্যে আমি মুক্তিযোদ্ধা রাকিবকে থার্ড আম্পায়ার ভাবতে চাই না। আমি ভাবতে চাই মুক্তিযোদ্ধা রাকিব, একাত্তরের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে যে সাহস ও মানবিকতা সৃষ্টি করেছে, রাকিব ফার্স্ট আম্পায়ার।

পৃথিবীতে মানুষ দুই প্রকার। নারী ও পুরুষ। বাস্তব অবস্থায় নারী ও পুরষ গল্পকারদের মধ্যে মাতৃত্বের স্বাধ নিয়ে গল্প লেখা কঠিন। নারীর মাতৃত্ব নিয়ে পুরুষ গল্পকারেরা গল্প লেখেননি, এমনটা নয়। অনেক গল্পকারই লিখেছেন। কিন্তু মাতৃত্ব নিয়ে নারী গল্পকার লেখেন চেতন দরজার ওপাশে দাঁড়িয়েও হয়ে ওঠে শ্বাশত সুন্দর…। শুরুতে যে অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে লিখেছিলাম, সেই পরিপ্রেক্ষিত কাদামাটির বাস্তব হয়ে ওঠে। সেই অপরূপ সুন্দর আর ভেঙ্গে যাওয়া আকাশের টুকরো টুকরো মেঘে সাজিয়েছে ইশরাত তানিয়া গল্প ‘ঋতু বৈচিত্র্যময়’। নগরের জীবন স্বামী স্ত্রীর। স্বামী আতিক। স্ত্রী লুবনা। দুজনে চাকরি করে। কোনোভাবে সংসার চলে। আবার দুজনে হিসেবীও। হিসেবের কারণে সন্তান নিতে একটু দেরী করে। বিয়ের দুবছর পর সন্তান নিতে গিয়ে সমস্যা হওয়ায় ডাক্তারের কাছে যায় লুবনা ও আতিক। ডাক্তার কয়েকটা টেস্ট দিয়েছে। টেস্ট হয়েছে, রিপোর্ট এখনও হাতে আসেনি। রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে। ঠিক সেই সময়ের লুবনা- “একমাস দশদিন হয়ে গেল। লুবনার পিরিয়ড হচ্ছে না। নির্জন ঘরে বিহ্বল বসে সে। এতদিন পর শরীরে নেমে এলো শীতের নরম রোদ্দুর নাকি অগ্রহায়ণের নতুন ধান। ধান, ধানের কুটো, দুর্বা ঝরছে শরীরময়। কী এক লজ্জা, কী মিষ্টি-কী মিষ্টি, শিরশিরে, নিবরচ্ছিন্ন আনন্দের ঢেউ একটু একটু করে ওর গায়ে আছড়ে পড়ছে।”

আহ, মাতৃত্বের এমন দুগ্ধগন্ধময় গভীর বোধনের অনিঃশেষ অনুভব কোথায় পাবো, যদি ইশরাত তানিয়া না লিখতো? পৃথবীর কোটি কোটি মায়ের শ্বাশত কল্যাণকর এই তীক্ষ্ম তীব্র গভীর আশ্লেষকে অনন্য অনুভবে উপস্থাপন করেছে ‘ঋতু বৈচিত্র্যময়’ গল্পে। তাহলে কোথায় গল্প শুরু ও শেষ করেছে ইশরাত? লুবনার মাতৃত্বকে জাগ্রত করে দিয়েই বিদায় নিয়েছে? না, ইশরাত জানে, একটা গল্প সম্পূর্ণ গল্প কিভাবে হয়ে ওঠে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে গল্পটাকে এগিয়ে নেয়, গল্পের সকল উপাধানকে ধারণ করে।

এক ধরনের গভীর এষণায় অফিসে যায় লুবনা। বিচিত্র ভাবনায় তাড়িত সে। বাসায় ফিরে রাতে আতিককে জানায়। আতিক খুশি। কিন্তু সকাল? রাতের পরের সকালটাই মূলত একটি সম্পূর্ণ গল্পের পরিকাঠমো নিয়ে আমাদের সামনে হাজির করে ইশরাত তানিয়া।

‘তীব্র অস্বস্তিতে লুবনার ঘুম ভাঙ্গে। ফোঁটা ফোঁটা আলো ছড়াচ্ছে আকাশ। সে টয়লেটে যায়। ফিরে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়… এমন একটি ভোরের কথা গতকাল লুবনা ভাবেনি। টেষ্ট কিট ঘুমিয়ে আলমারির ভেতরে। বাইরে আশ্বিনের ভোর ঠান্ডা বাতাস ছড়ায়। চব্বিশ ঘন্টার স্বপ্নযাপন শেষ। লুবনার মনে পড়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে হবে। কাক ডাকছে, চড়ুইও। কী এক প্রতীক্ষায় লুবনা বারান্দায় দাঁড়িয়েই থাকে। আজকের ভোরটিও অভাবিত তবে গতকালের ভোরের মতো নয়।’

গল্প কী শেষ হয়? না, গল্পের মধ্যে দিয়ে লুবনার তাড়িত হতাশায় আমি, আমরাও আহত হই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইশরাত তানিয়া মুগ্ধ মানসের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে গল্পটার সঙ্গে লুবনার ‘ঋতু বৈচিত্র্যময়’ আমাদের নতুন করে প্রকৃতির খেলা দেখায়।

‘বীজপুরুষ’ ইশরাত তানিয়ার গল্পবইয়ের প্রথম গল্প। গ্রামীণ আদি কাঠমোর মানচিত্র থেকে ‘বীজপুরুষ’ গল্পের আখ্যান তুলে এনেছে গল্পকার। গল্পের নায়িকা নীলুফার। স্বামী পরিত্যাগ করেছে ওকে। বাবা মালেকের বাড়িতে থাকে। বাবাও একা। সারাদিন সংসারের কাজ করে আর আছে একটা নকশাদার বাক্স। যে বাক্সটা বানাচ্ছে কারিগর। মালেকের ছোট ভাইয়ের বই আয়েশা বলে, ‘ভাইসাব, নীলুর ডাক্তার কবিরাজ এইবার ছাড়ান দেন। আমি ভাবিরে খোয়াবে দেখছি। ভাবি কইছে কারিগরের বাক্সের ফজিলতে এইবার কাম অইব।’

বাক্সটা পেলে নীলুর অলক্ষণের দোষ কেটে যাবে। হাজার বছর ধরে গ্রামীণ লৌকিক জীবেনর নানা তুকতাক মানুষকে কতোটা সংক্রমিত করে রেখেছে, তারই বয়ান ইশরাত তানিয়া নিজের পরিকাঠামোয় তৃষ্ণায় নির্মাণ করেছে এই গল্পে। সেই পরামর্শ থেকেই কারিগরকে ডেকে এনে বাক্স বানানোর কাজ দিয়েছে মালেক। কারিগর মনের যাবতীয় সুষমা মিশিয়ে বাক্স বানাতে থাকে। কেমন সেই বাক্স?

“এবার বাক্সের কথা বলা যাক। কাঠের ওপর ফুল পাতা কলকার নকশা করে কারিগর বাক্স বানায় একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। সরল মনে বাক্সের বাইরের চারদিকের অংশে একের পর এক চৌকোণা আর ত্রিভুজাকৃতির জটিল নকশা ফুটায় সে। জ্যামিত্যিক নকশা ছ্ড়াাও চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, চন্দ্র সূর্য, ময়ূরপক্ষী নৌকা, ফসলের ক্ষেত, ছেলের হাতে নাটাই ঘুড়ি এবং আরও নানা রকম বৈচিত্রময় সূক্ষè চিত্র তৈরি করে কাঠ খোদাই করে। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়গুলোকে সম্পর্কহীন মনে হলেও সারা বাক্স জুড়ে নকশার কারুকার্য আর শিল্পের সুষমায় সব কিছু আশ্চর্য রকম সুবিন্যস্ত। বাক্সটা খুব বড় নয়, অনেকটা গয়নার বাক্সের মতো। কোনো হুড়কো নেই এতে।“

বাক্স আসলে উপলক্ষ। নীলুফার যায় কারিগরের কাছে। কারিগর বাক্সটা নীলুফারকে দিয়ে দেয়। বাক্স দিয়ে নীলুফার কী করবে? যদি কারিগর বুঝতো? কিন্তু কারিগর তো কথা কয় না। এক অব্যক্ত যন্ত্রনায় নীলুফার কেঁপে ওঠে। এবং আমরা পাঠকেরা গল্পের শেষে সংবাদ পাই “নীলুফারের ভেতরে ভ্রুন সঞ্চার হয়েছে। সে সমাচ্ছন্ন হয়ে যায় অজাতকের স্নেহস্পর্শে। ঝাপসা চোখে নীলুফার তাকায়। বহুদূরে ধোঁয়াটে নীল অন্ধকারে।”

গল্পের ভেতর অজস্র গল্প জারিত থাকে। গল্পের নানারূপ দাগ থাকে। থাকে নানা নালা মুখ। থাকে অবিরাম যাত্রা পথ। সেই পথের পথিক আমরা। বিচিত্র এবং বিবিধ পথে আমাদের বিমূর্ত যাত্রা। হাতে হাতে রেখে যাত্রায় কেউ ছিটকে যায়, কেউ দরজা খুলে প্রবেশ করে অন্তপুরে। নীলুফার কী অন্তপুরের টিকেট পেয়েছে? নিশ্চয়ই পেয়েছে। নইলে ভেতরে ভ্রুণের জাগরণ ঘটবে কেনো? প্রশ্ন জাগে, বীজপরুষ কে? বাক্সের কারিগর? নাকি বাক্সটাই? প্রাচীনকালের আখ্যানে আমরা কতো নিষাদের গল্প জেনেছি। জেনেছি কতো যাদু ভারাক্রান্তের চক্রান্ত। সেইসবে সওয়ার হয়ে আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি গল্পকার ইশরাত তানিয়ার গল্পগ্রন্থ ‘বীজপুরুষ’ এর দরজায়। কে খুলবে দরজা? ইশরাত তানিয়া? নাকি বহুমাত্রিক গল্প আখ্যানের চরিত্রগুলো? যে-ই দরজা খুলুক, আমার লিখতে দ্বিধা নেই, আমাদের গল্পের পৃথিবীতে নতুন কিন্তু প্রবল পরাক্রান্ত এক গল্পকার এসেছে। সে ইশরাত তানিয়া। ইশরাতের গল্পগুলো, দু একটা বাদে সবই পাঠ করেছি নিবিড় মনে। পাঠ করার পর মনে হয়েছে, ইশরাত তানিয়া জেনে শুনে গল্পের বিষ পান করতে এসেছে এবং একটি গল্পগ্রন্থের গল্প দিয়ে প্রমাণ করেছে, গল্পের ক্যানভাস ও ইজেলে আরও বহুবিধ গল্প সে আঁকবে।

ইশরাতের গল্পে বড় সম্পদ, চমৎকার একটি ভাষা শৈলী। যে ভাষায় নিজের মনে পথ চলতে চলতে গল্প লিখতে পারে অনায়াসে। গল্পের শরীর বুননেও ওর ক্ষমতা অসাধারণ। না বলা গল্পটি সাবলীল সত্তায় প্রকাশ করা কঠিন, ইশরাত তানিয়া সেই কঠিন কাজটিই করে সহজে, সাজিয়ে পান খাওয়ার ঢংয়ে।


423 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *