লায়লা মুন্নীর দশটি কবিতা



ধূলিমাখা খাঁচা
ধূলিমাখা শহরের ধুলিকনাগুলো
ধূলার আবরন তৈরি করেছে
তোমার আমার সুখময় স্মৃতিগুলোতে,
তবুও স্মৃতিরা কখনো কখনো বৃষ্টিস্নাত হতে চায়,
ফিরে পেতে চায় সজীব সবুজ।
ইটকাঠের খাঁচার শহরের এ কঠিন খাঁচাগুলো
লোহার শেকলে বন্দী করেছে
তোমার আমার দুরন্ত অনুভুতিগুলোকে,
তবুও অনুভুতিগুলো কখনো কখনো মুক্তি পেতে চায়
ফিরে পেতে চায় দিগন্ত জোড়া ছুটে চলা।
ধূলিমাখা, শঙ্খলিত তুমি আমি কেবল অপেক্ষা করি,
তোমার আর আমার ফিরে পেতে চাওয়াগুলোই
হয়তো ফিরিয়ে দিবে কোন একদিন,
সুখময় স্মৃতির, দুরন্ত অনুভুতির ছুটেচলা গুলোকে,
নতুন কোন তুমি আর আমিকে।
সময়োচিত মহাপ্রলয়
ব্যস্ত মেঘে হেঁটে চলা বিন্দুবিসর্গ,
সাগর স্নানের জলকেলিতে আহ্লাদিত।
পাহাড়চূড়ায় বৃষ্টিস্নাত কদমের  মাদকতা,
অবরুদ্ধ লাল নীল প্রজাপতির স্বচ্ছ ডানায়।
এক অজানা দুঃসাহসের ব্যথাতুর মলিনতায়,
নবরূপকারে আবির্ভূত তারা সত্য জন্মে।
একবার, একটিবার, এক পরিপূর্ণ প্রার্থনায়
জীবন্মৃত প্রাণে অঙ্কুরিত হচ্ছে সময়োচিত মহাপ্রলয়।
 আমার তুমি 
আমি হতে চাইবো একটি ভোর , একটি সোনালীরোদ্দুর,
সোনালী আভায় আলোকিত হবো আমি,
সাথে থাকবে সরব প্রকৃতি, আমার প্রকৃতি হবে তুমি।
তুমি হবে আমার তুমি।
আমি হতে চাইবো একটি মধ্যদুপুর, একটি তাপদাহ,
কঠিন তাপদাহে পুড়ে খাঁটি হবো আমি,
সাথে থাকবে গাছের ছায়া, আমার ছায়া হবে তুমি।
তুমি হবে আমার তুমি।
আমি হতে চাইবো একটি পড়ন্ত বিকেল,একটি গোধুলি,
গোধুলির রঙে রঙীন হবো আমি,
সাথে থাকবে ক্লান্ত পাখিরা, আমার পাখি হবে তুমি।
তুমি হবে আমার তুমি।
অতঃপর আমি হতে চাইবো ধ্রুবতারা, একটি নক্ষত্র,
আপন আলোয় আলোকিত হবো আমি,
সাথে থাকবে সপ্তর্ষিমণ্ডল, আমার সঙ্গী হবে তুমি।
তুমি হবে আমার তুমি।
কেবল আমি হতে চাইবো না মানুষ,কোন মানবী,
মানবীয় গুনাবলী অর্জন করবো না আমি,
সাথে থাকবে না আমার বিবেক,
আমার পাশে কখনোই থাকো না যে তুমি!
তুমি কি আমার তুমি?
আমার আকাশ আর তুমি
 আজ সারাটাদিন তুমি কাছে নেই,
 কালও ছিলে না, কিংবা পরশু
 এখন কোথায় থাকো তুমি  ?
 এ কথাটা আর জানতে ইচ্ছে হয় না আমার ।
 একটা সময় তুমি আমার কাছেই ছিলে,
 সারাটা দিন, সারাটা মাস, সরাটা বছর।
 তখন কেন ছিলে তুমি ?
 এ কথাটাও আর জানতে ইচ্ছে হয় না আমার ।
 অথচ আজো মাথার উপর আকাশটা একই আছে,
 সেই আগের মতোই নীল, তাতে সাদা মেঘের ভেলা।
 এখনো আকাশে মেঘ হয়, বৃষ্টি নামে।
 রাতের আকাশে এখনো চাঁদ ওঠে,
 হাজার তারার মেলা বসে।
 এখনো ছুটেচলা তারাটিকে হয়ত খুঁজে বেড়ায়,
 দুই জোড়া স্বপ্নিল চোখ।
 তবে আজকাল নীল আকাশটিতে
 নিঃসঙ্গ সোনিলী ডানার চিল খুব বেশী উড়ে বেড়ায়।
 আবার যখন রাতের আাকাশে,
 চাঁদটার দিকে তাকিয়ে,
 মনে করি তোমার কথা।
 ঠিক সে সময় একখন্ড মেঘ এসে ঢেকে দেয় চাঁদটাকে,
 হাজার তারার ভীড়ে আড়াল হয় চাঁদটা।
 আড়াল হয়ে যায় চীরচেনা চাঁদটা আমার থেকেও।
 ঠিক এমনই আড়াল বোধহয় হয়ে গেলাম আমরা
 দিনে, মাসে, বছরে, আর তাই
 যখন তুমি একেবারেই থাকবে না আমার কাছে ,
 হাজারটা দিন, হাজারটা মাস, হাজারটা বছর,
 তখন কোথায় থাকবে তুমি ?
 এ কথাটা খুব জানতে ইচ্ছে হয় আমার ।
অগ্রসরমান অবধারিত মৃত্যু
মায়ার এক মিথ্যে আবহে ঘেরা চারপাশ।
এক ঝাঁক পায়রা আকাশে ওড়ে না,
একটি মূয়ূর তার পেখম মেলে না।
একটি কদম হাতে নিয়ে দাড়ায় না
কোন প্রেমিক তার প্রেমিকার জন্য।
পৃথিবী আজ অসার,নির্জীব, নিথর, নিরেট লাশ।
মিথ্যে প্রবোধে আর কতো বেঁচে থাকা,
আর কতো দেখে যাওয়া অধরা স্বপ্ন।
একটি কবিতা?  না একটি কদম?
কার জন্যে কার বেঁচে থাকা এ অনাহুত জন্মে?
খুব একটা ঝড় হোক,
ওলট পালোট করে দিয়ে যাক কবিতাকে,
গগনবিদারী চিৎকারে,
কদমের ডালগুলো খসে যাক,
এ নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একটি কদমের জন্য
একটি কবিতালেখা বন্ধ হোক, বন্ধ হোক।
শেষ হোক প্রহেলিকার আলো,
বেঁচে থাকাটা হোক অগ্রসরমান অবধারিত মৃত্যু।
মেঘলা কদম 
কবিতা লেখার কালির মতো কালো মেঘ গুলো যখন অস্থির ঘুরে বেড়ায় নীল অসীমে,
তখন মনে হয় কবিতা গুলোই সাজায় আকাশ,
এইতো এইমাত্র ঝরা শুরু করলো কবিতার বর্নগুলো, চারিদিকে  বর্ণ, ঘর বাড়ি গাছ পালা, টিনের চালে ঝমঝমিয়ে পড়ছে বর্ণগুলো,
কদমের গায়ে ভালোবাসা বর্ণগুলো লুটোপুটি খাচ্ছে,
দুবেনী এলিয়ে সদ্য কিশোরী হয়ে ওঠা মেয়েটি কেমন খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে কদম দেখছে,
ওর এই হাসিতে কদম হাতে দাড়িয়ে থাকা তরুনটিও আজ বিমোহিত,
স্বপ্নিল এ দৃশ্যগুলো যখন বৃষ্টিমায়ায় ধরা দিচ্ছিলো আমার মেঘ চোখে,
হঠাৎ এক দমকা হাওয়া এসে লাগলো মুখে, সম্বিত ফিরে চলে এলাম সময়ে,
কোথায় বর্ণ, এ যে কালবৈশাখী,
যে মেঘেদেরকে কবিতার রঙ ভেবেছিলাম তারা তো কবিতার সে বর্ণ ধারন করে না,
তারা আনে ধ্বংস, এ নৈরাশ্যের পৃথিবীতে কবিতার রঙে ধ্বংস করে তারা অনুভুতিকে।
অতঃপর অষ্টপ্রহরের কালো সময়, চারটি জমাট প্রকোষ্ঠ, দুটি জলভরা নদী, একটি মরচেধরা মস্তিষ্ক আর মেঘলা কদম নিয়ে আবার শুরু হলো
মিথ্যে আমার কবিতা যাত্রা।
একই ভিন্নতা
একই আকাশ, তোমার মতো আজও তো আমার আছে
তবু কেন তোমার আকাশ, আমার থেকেও খুবই কাছে?
একই সবুজ, তোমার মতো আছে তো বেশ আমার পাশে
তবু কেন তোমার সবুজ, আমার চেয়েও সজীব সাজে?
একই দীঘি, তোমার মতো আমার চোখে কাজল পরে,
তবু কেন তোমার দীঘির, পদ্মপাতায়  শিশির ঝরে?
একই রাতে পূর্নিমা চাঁদ,তোমার মতো আমায় জাগায়,
তবু কেন তোমার পূর্নিমাটা আমায় শুধু একাই কাঁদায়।
একই নীল, তোমার মতো আছে আমার নীলাম্বরে
তবু কেন তোমারই নীল আমার ছাড়ে আড়ম্বরে।
একই সাগর, তোমার মতো আমার মনে জোয়ার আনে
তবু কেন তোমার সাগর, সুরটি তোলে অন্যখানে।
একই পথে, তুমি আমি হাঁটি যখন ইচ্ছে জাগে
তবু কেন পথটি শুধু, আমার কাছেই ভিন্ন লাগে?
শিশির জীবন
জীবন যেনো পদ্ম পাতায় শিশির
টলমলানো পাতায় থাকে দীঘির।
দীঘি যেনো কাজল কালো চোখ
তোমার সাথেই আমার দেখা হোক।
চোখ যেনো এক ভরা জলের নদী
বয়ে যেতে চায় যে নিরবধি।
নদী যেনো জাগায় সবুজ চর,
যেখানে বাঁধা যায় যে সুখের ঘর।
ঘর যেনো এক ছোট্ট পাখির নীড়,
গড়ার খেলায় ভাঙে নদীর তীর।
নীড় যেনো এক গাছের ছায়ায় থাকে,
তোমায় আমায় চুপটি করে ডাকে।
ছায়া যেনো তোমার আমার মায়া
জীবনটাতে নয়তো কিছু চাওয়া।
মায়া যেনো চোখে আনে জল,
মধুর স্মৃতিতে চোখ জোড়া ছলছল।
জল যেনো প্রেমের বিন্দু বিন্দু শিশির,
পদ্মফুলের মাতাল হওয়া আবির।
শিশির যেনো ছোট্ট একটি জীবন,
ভালোবাসা পেতে চায় যে মন।
মুখোশ ও মনুষ্য বিশ্বাস
আমার চারপাশে হাজার রঙের মুখোশ,
মাঝে ঠায় দাড়িয়ে বেমানান আমি
এক মনুষ্য অবয়ব।
মুখোশের বাইরে জীবন নেই তা কেবল যাপন,
মুখোশের আড়ালে প্রান নেই তা কেবল প্রাণী।
মুখোশের রঙগুলো আমাকে করে আচ্ছন্ন
পরক্ষণেই নীল বিষের ব্যথায় করে দংশন।
মুখোশের অট্টহাসি প্রতিধ্বনিত করে আমার চারপাশ,
আমি নীল বিষে চূর্ণ হই বার বার, প্রতিবার।
তবুও মনুষ্য বিশ্বাস আমাকে স্বপ্ন দেখায়,
অপেক্ষায় থাকি আমি, হয়তো মুখোশ উবে যাবে।
হাস্যোজ্জল মুখাবয়বের একটি মুখশ্রী
আমাকে সোনালী একটি ভোরের গল্প শোনাবে।
যে গল্প স্পর্শ করবে আমার মনুষ্য হৃদয়,
আমি সেই ক্ষণের প্রতীক্ষায় ঠায় দাড়িয়ে থাকি
বর্নীল মুখোশের ভীড়ে।
১০
অমরত্বের আড়াল
তুমি এভাবে আড়াল হবে বুঝিনি,
আড়াল হওয়া হয়তো খুব সহজ তোমার কাছে।
যেমনি সহজ ছিলো আমায় তোমার ভালোবাসা,
যেমনি সহজ ছিলো আমার থেকে তোমার দূরে যাওয়া।
হয়তো তেমনি নিজের ধ্যনেই ডুবে গেছো সংসার সমুদ্র থেকে খুব দূরে জীবনানন্দের নিরালা নীড়ে, …
তোমার সে ধ্যনমগ্নতায় আমি হয়তো নেই,
আমার ছায়া নেই,
আমার ভাবনাগুচ্ছও নেই।
তবে কি আছে তোমার সে আড়ালে ??
কি পেতে চাইছো তুমি??
পেতে কি চাইছো অমরত্ব,??
যে অমরত্বের টানে জগৎ সংসার ছেড়ে যায়
মাধুকরেরা।
যে অমরত্মের টানে সংসার ত্যাগী হয়েছে,
কোন কালে সংসারী হওয়া কোন বিজন ঘরের পরবাসী।
তবে জেনে রেখো তোমার সাধনার সে অমরত্বের প্রাপ্তি, তোমার হবে না সে ধ্যানে,
হবে না সে মগ্নতায়,
যুগে যুগে কোন প্রিয়তমার বাহুডোর এড়িয়ে কোন অমরত্ব পায়নি কোন সাধক, পেতে পারে না।
তুমি হয়তো জানোনা, জানেনি তোমার সে ধ্যান, সে মগ্নতা, জানেনি তোমার রক্তিম পূন্যবান হৃদয়,
তোমার সে বহুল কাঙ্খিত অমরত্ম  লুকিয়ে আছে আমার আগুন পোড়া মনের বিশ্বাসের অভিশপ্ত নিস্তব্ধতায়।

1,501 Comments